নারীর প্রতি সহিংসতা: মানব মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়


নারীর প্রতি সহিংসতা: মানব মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। কিন্তু সেটা তার শারীরিক আকার, গঠনের দিক থেকে নয়। সেটা একমাত্র তার উপযুক্তু ইতিবাচক আচরনের কারনে। ইতিবাচক আচরন তখনই একজন মানুষ শিখতে পারে যখন তার মধ্যে মূল্যবোধ, শৃঙ্খলাবোধ, শ্রদ্ধার মানসিকতা, অন্য একজন মানুষকে দেখলে সম্মান দেওয়ার ইচ্ছা জাগ্রত হবে। তবে সম্মান কথাটা বলতেও এখন চিন্তা করতেে হয়। কেননা কিছু মানুষরুপী হিংস্র পশুরা আজকের দিনে নারীকে শুধু ব্যবহারের পণ্য ছাড়া, ভোগ বিলাসের বস্তু, শারীরিক চাহিদা মিটানোর হাতিয়ার ছাড়া আর কিছুই ভাবেনা। এই খবরগুলো শুনলে  মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব বলতে লজ্জা পেতে হয়।

ধর্ম ও সমাজ স্বীকৃত নিয়ম নারী পুরুষ সমান অধিকার। তবে এখন নারীর সেই বেচে থাকার জন্য অপরিহার্য মৌলিক অধিকার কোথায়? নারীকে ঘরবন্দি করার পরও কি নারী আজ নিরাপদ? নাহ নিরাপদ নাহ। একজন নারী প্রতিনিয়তই সহিংসতার শিকার হচ্ছে। হোক সেটা নিজেরই ঘরে অথবা নিজের ঘরের বাইরে। নারী তার ঘরে আপনজনদের দ্বারাই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। শিশু হোক বা কিশোরী কেউই হায়নাদের নির্মম অত্যাচারের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। একজন নারী আজ বিবাহিত হওয়ার পরেও, তার নিজের স্বামী সাথে থাকার পরেও জীবনের নিরাপত্তাটুকু পর্যন্ত পায়না! ভাই, বন্ধু, মামা, চাচা আর পাশের বাড়ির প্রতিবেশির কথা তো না হয় নাই বললাম। বর্তমানে এরকমটাই নারীর ঘরবন্দি অবস্থায় জীবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

এইবার যদি বাহিরের জগতে নারীকে নিয়ে যাওয়া যায় তাহলে কতোটুকু নিরাপত্তা নারীর জন্য রয়েছে। "তোমার একা কি দরকার এতো ভোরবেলা কাজে যাওয়ার? কি পোশাক পড়লে এইটা তুমি সবাই তো তাকিয়ে থাকবেই, তুমি কেন রাস্তার বখাটেদের সামনে দিয়েই আসলে, এমন তো হবেই। দেখেছিলাম কতো ছেলের সাথে ওঠাবসা ছিলো এই মেয়ের,ওরে বাবা রে" -এই ধরনের হাজার হাজার কথা আমরা হরহামেশাই শুনি আমাদের খুব আদরের বাইরের জগতের মানুষের কাছ থেকেই। কি সুন্দর নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করা নারীর জন্য ভাবতেই অবাক লাগে!

কথায় বলে, "যতো দোষ নন্দ ঘোষ।" পাড়ার লোকে তখন নারীর আওয়াজ শুনতে পেলে দোষটা নারীকেই দেয়। কারন নারীর তো চিৎকার করা বারন, মুখ বুজে সহ্য করাই নারীর ধরন! কিন্তুু সমাজের লোকেরা এটা জানতে চেষ্টাও করেনা যে কেনো এবং কোন পর্যায়ে গেলে একজন নারীও পুরুষের মতো চিৎকার করে। নারী তো ঘরের লক্ষী, সে কেনো চাইবে অযথা তার সংসার, তার সম্মান, তার মর্যাদাকে ক্ষয়িষ্ণু করতে? নারী তো চায় সবকিছুকে একসাথে জুড়ে রাখতে। বোকা সমাজ এই বিষয়টা বুঝে না। শুধু অপরাধ ঘটে যাওয়ার পরে তদন্তের নামে একটা আইনগত নিয়মের আওতায় নারীকে এনে সঠিক বিচারের কথা দিয়ে নারীর মুখে সারা জীবনের জন্য আঠা লাগিয়ে দেওয়া হয়।

নারীর অধিকার নারীকেই আদায় করতে হবে। তবে অবশ্যই সমাজ, পরিবার আর রাষ্ট্রকে ও এগিয়ে এসে নারীকে সাহায্য করতে হবে। কেমন করে তার কিছু উদাহরন:
১. মেয়েকে অবশ্যই শিক্ষার সমান সুযোগ দিতে হবে।
২. মেয়ে সন্তান, তাই তাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে হবে কোন ভাবেই এই চিন্তা মাথায় আনা যাবেনা অভিভাবকদের।
৩. চাকরি করার জন্য মেয়ে সন্তানকে উৎসাহ দিতে হবে।
৪. শারীরিক নির্যাতন বন্ধের বিষয়ে সচেতন হতে হবে সবাইকে।
৫. সহিংসতার প্রথম থেকেই সবাই মিলে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করতে হবে।
৬. নারীর প্রতি সকল ক্ষেত্রেই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ করতে হবে।
৭. ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীকে দুর্বল ভাবা যাবে না।
৮. নারীকে সুন্দরভাবে চলাফেরার স্বাধীনতা দিতে হবে।
৯. নারীকে কোনোভাবেই চাহিদা পূরনের হাতিয়ার ভাবা যাবেনা।
১০. সর্বোপরি সুস্থ মস্তিষ্কে নারীকে শুধু নারী না ভেবে মায়ের জাতি ভাবা উচিত।

যেদিন আমাদের সমাজ আমাদের কন্যা শিশু, কিশোরী এবং নারীকে নারী না ভেবে মানুষ হিসাবে ভাববে সেদিন আমাদের সমাজে নারীর প্রতি এই সহিংসতাও বন্ধ হবে। তাই আসুন, আমরা নারীকে লিঙ্গান্তর না করে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ও মূল্যবোধের স্থানান্তর করি। সুন্দর রাষ্ট্র গড়ে তুলি।

লেখক:
সানজিদা মাহমুদ মিষ্টি
সানজিদা মাহমুদ মিষ্টি
শিক্ষার্থী,শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

No comments

Powered by Blogger.