স্বাস্থ্যখাতে বঙ্গবন্ধুর অবদান


স্বাস্থ্যখাতে বঙ্গবন্ধুর অবদান

স্বাস্থ্য হচ্ছে একটি পরিপূর্ণ শারীরিক , মানসিক ও সামাজিক সুস্থ অবস্থা ; শুধুমাত্র রােগব্যাধি বা দুর্বলতার অনুপস্থিতি নয় । রাষ্ট্রের নিকট জনগণের অন্যতম চাহিদার একটি হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা । যিনি কিশাের বয়স থেকেই সত্য , ন্যায় ও শােষিত মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন তিনি হলেন বাংলার বন্ধু , সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি , জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । স্বাধীনতা - উত্তর স্বাস্থ্য বিপর্যস্ত বাংলাদেশের মানুষের জন্য তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানাে । এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন একটি স্বাধীন , সার্বভৌম সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার ।

বাংলার মানুষের সাংবিধানিক , রাষ্ট্রীয় এবং রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে প্রাধান্য দিয়েছেন অন্ন , বস্ত্র , বাসস্থান , শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যখাত । তাই তিনি তার প্রজ্ঞার আলােকে ১৯৭২ সালে গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ ( ক ) এবং ১৮ ( ১ ) এ চিকিৎসাসেবা এবং জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন । বঙ্গবন্ধু ভেবেছিলেন একটি সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়তে হলে চাই একটি স্বাস্থ্যবান জাতি । এজন্য স্বাস্থ্যখাতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে তিনি আন্তরিকভাবে মানবিক দায়িত্ব হিসেবে কাজ করার অনুরােধ জানান । দেশের গরিব - মেহনতি মানুষ যেন সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা পায় , সেদিকে সবাইকে বিশেষ দৃষ্টি রাখার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেছিলেন এবং বাস্তবায়নের জন্য গ্রহণ করেছেন সময়ােপযােগী পদক্ষেপ ।

বঙ্গবন্ধুর তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার জন্য থানা স্বাস্থ্য প্রকল্প আজও বিশ্বের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার এক সমাদৃত মডেল । বঙ্গবন্ধুর ( ১৯৭২-১৯৭৫ সাল ) পদক্ষেপের মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখযােগ্য:
১. আইপিজিএম অ্যান্ড আরকে ( পিজি হাসপাতাল ) শাহবাগে পূর্ণাঙ্গ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল হিসেবে স্থাপন ।
২. বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল ( বিএমআরসি ) প্রতিষ্ঠা ।
৩. বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জন্স ( বিসিপিএস ) প্রতিষ্ঠা ।
৪. জাতীয় পঙ্গু পুনর্বাসন ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল স্থাপন ।
৫. স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন ।
৬. ১৯৭৩ সালে প্রণীত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাকে অধিকতর গুরুত্ব প্রদান ।
৭. চিকিৎসকদের সরকারি চাকরিতে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা প্রদান ।
৮. বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল ( বিএমডিসি ) প্রতিষ্ঠা ।
৯. নার্সিং সেবা ও টেকনােলজির উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা ।
১০. জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ( নিপসম ) স্থাপন ।
১১. ঢাকা শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা ।
১২. জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান স্থাপন ।

শুধু চিকিৎসক ও হাসপাতালও নয় , বঙ্গবন্ধু গুণগত মানসম্পন্ন ওষুধের দিকেও নজর দিয়েছিলেন । তিনি ওষুধ নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেন যার লক্ষ্য ছিল ক্ষতিকর , অপ্রয়ােজনীয় , বেশি দামি ওষুধ আমদানি বন্ধ এবং ওষুধের যৌক্তিক ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা । সেই সঙ্গে তিনি ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তর ও ওষুধ নিয়ন্ত্রনে একটি নীতিমালা তৈরি করেছিলেন । ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতি প্রণয়নের সময় বিশেষজ্ঞ কমিটি বঙ্গবন্ধুর এসব নীতিমালাকে ভিত্তি হিসেবে অনুসরণ করেছিলেন । পাশাপাশি ১৯৭৪ সালে ফার্মাসিস্টদের পেশাগত রেজিস্ট্রেশন প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ।

মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে তিনি স্বাস্থ্য খাতে উন্নতির যে গ্রাফ ( প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষভাবে ) প্রণয়ন করেছিলেন তার উপর ভিত্তি করে বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি , মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় , হাসপাতাল শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি , স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ প্রভৃতি বিশ্বনন্দিত অনেক কার্যক্রম গড়ে তুলেছেন এবং পূর্ণতা দিয়েছেন । বাংলাদেশে বর্তমানে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাত , বিভিন্ন এনজিও ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে । আমরা জাতির পিতার ত্যাগকে একটু অনুধাবন করে স্বাস্থ্যখাতকে যেন আরও গুরুত্ব দেই ও স্বাস্থ্যখাতে জড়িত মহতী কর্মও যেন নিষ্ঠার সাথে পালন করি । সেটাই হবে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের শ্রেষ্ঠ উপায় ।

লেখক:
রঞ্জন কুমার সরকার
শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

No comments

Powered by Blogger.