এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশের পথে স্বপ্নযাত্রা: প্রত্যাশা এবং চ্যালেঞ্জ


এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশের পথে স্বপ্নযাত্রা: প্রত্যাশা এবং চ্যালেঞ্জ

সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২১ সালের প্রথম দিকে হয়তো আসতে পারে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যেখানে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য সুপারিশ করা হতে পারে। যদিও প্রথম দৃষ্টিতেই সংবাদটি আমাদের জন্য অনেক আনন্দের মনে হতে পারে কিন্তু বাংলাদেশে কি প্রস্তুত এত বড় সম্মান বহন করার জন্য?বাংলাদেশ কি পারবে এত বড় সম্মান কাঁধে করে নিয়ে সমস্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সামনে এগিয়ে যেতে? আর আদেও কি এই যাত্রাপথ অনেক মসৃণ না কন্টকাকীর্ণ?

যেহেতু এটি একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন সুতরাং পরিষ্কার হওয়া উচিত যে এলডিসি দেশ বলতে কাদেরকে বোঝায় ?
এলডিসি ভুক্ত দেশগুলি নিম্ন স্তরের আয়ের এবং টেকসই বিকাশের গুরুতর কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা দ্বারা চিহ্নিত দেশ। এই বিভাগটি ইউএন সাধারণ পরিষদ (ইউএনজিএ) কর্তৃক ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল এ উদ্দেশ্য নিয়ে যে, উন্নয়নশীল এবং উন্নত দেশগুলোর মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদানের উদ্দেশ্যকল্পে।

বর্তমানে ৪৭ টি দেশ এলডিসি বিভাগের অংশ। এখন পর্যন্ত মালদ্বীপ সহ মোট পাঁচটি দেশ এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে।

যে সকল বিষয়গুলোর মানদন্ডের বিবেচনায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ একটি দেশকে এলডিসির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করেন?

স্বল্প আয়ের মানদণ্ড:
মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) তিন বছরের গড় অনুমানের ভিত্তিতে (অন্তর্ভুক্তির জন্য ৭৫০ মার্কিন ডলারের এর নীচে, স্নাতক প্রাপ্তির জন্য ৯০০ মার্কিন ডলারের এর উপরে)।

মানবসম্পদ দুর্বলতার মানদণ্ড:
এর সূচকগুলির উপর ভিত্তি করে একটি যৌগিক মানব সম্পদ সূচক (এইচএআই) জড়িত:
(ক) পুষ্টি; (খ) স্বাস্থ্য; (গ) শিক্ষা; এবং (ঘ) প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সাক্ষরতার।

অর্থনৈতিক দুর্বলতার মানদণ্ড:
কৃষি উৎপাদন অস্থিতিশীলতার সূচকগুলির উপর ভিত্তি করে; পণ্য ও পরিষেবা রফতানির অস্থিতিশীলতা; অপ্রচলিত ক্রিয়াকলাপগুলির অর্থনৈতিক গুরুত্ব (জিডিপিতে উৎপাদন ও আধুনিক পরিষেবার ভাগ); পণ্যদ্রব্য রফতানির ঘনত্ব; এবং অর্থনৈতিক ক্ষুদ্রতার প্রতিবন্ধকতা।


জাতিসংঘ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে একটি উন্নয়নশীল দেশে স্থানান্তরকে স্বীকৃতি দেয়। এলডিসিগুলির অন্তর্ভুক্তি এবং স্নাতক থেকে স্নাতকোত্তর সিদ্ধান্তগুলি ইউএনজিএ বিশেষ শাখা কমিটি ফর ডেভলপমেন্ট পলিসি (সিডিপির) সুপারিশের ভিত্তিতে গৃহীত হয় যা ইউএন অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিল (ইসোসোক) দ্বারা অনুমোদিত হয়। এলডিসি বিভাগের অন্তর্ভুক্তি বা স্নাতকোত্তর যোগ্য হতে পারে এমন কোনও দেশ চিহ্নিত করতে ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনার সময় প্রতি তিন বছরে এলডিসির তালিকা বিশ্লেষণ করে ইসোসোকের সহায়ক সংস্থা সিডিপি এবং প্রতি তিন বছরে এলডিসির তালিকা বিশ্লেষণ করে।

তবে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘ। কোনও দেশ উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হতে পারে কিনা, সেই যোগ্যতা দেশের মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা দ্বারা নির্ধারিত হয় এই তিনটি সূচক। পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ হতে কমপক্ষে ছয় বছর সময় লাগে। যাইহোক, এই মানটি সর্বদা থাকে না, এটি পরিবর্তিত হয়। উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার আরেকটি উপায় হল একটি দেশ উন্নয়নশীল দেশ হতে পারে যদি মাথাপিছু আয় তাদের প্রথম ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনার সময়ের মাথাপিছু আয়ের তুলনায় দ্বিগুণ হয়। যদি কোন দেশ নির্ধারিত তিনটি মানের দুটিতে যোগ্যতা অর্জন করে তাহলে একটি দেশকে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার প্রাথমিক যোগ্যতা হিসাবে ঘোষণা করা হয়। সিডিপি প্রতি তিন বছর অন্তর এটি মূল্যায়ন করে। সিডিপি প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জনের পরে পরবর্তী তিন বছরের ধারাবাহিকতার দিকে নজর রাখে। তিন বছর পর সিডিপি সুপারিশ করে যে , যদি দেশটি সূচকগুলির মধ্যে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারে তবে এটি একটি উন্নয়নশীল দেশ হতে পারে, যদি এটি তিনটি সূচকের মধ্যে কমপক্ষে দু'তে মান অর্জন করে। 
এক্ষেত্রে,অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকটি অবশ্যই ৩২ পয়েন্ট বা তার নিচে হতে হবে। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ বা এর বেশি পয়েন্ট পাওয়া উচিত। মাথাপিছু আয় সূচকটি ১২৩০ মার্কিন ডলার থাকতে হবে। 

মার্চ ২০১৮ সালে সিডিপি আবিষ্কার করেছে যে বাংলাদেশ প্রথমবারের জন্য স্নাতকের প্রাথমিক মানদণ্ড পূরণ করেছে যা অন্য কোনও দেশের আগে হয়নি। যদি বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারের জন্য স্নাতক শর্ত পূরণ করে, ২০২১ সালের পরবর্তী ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায়, তাহলে সিডিপি ২০২৪ সালে এলডিসি বিভাগ থেকে উত্তরণের জন্য সুপারিশ করবে।

যার মধ্য দিয়ে শুরু হবে বাংলাদেশের নতুন বিশ্বের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং সীমাহীন সম্ভাবনার খোঁজে কঠিনতর যাত্রা। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, একদিকে যাত্রাটি খুব আনন্দের। অন্যদিকে চ্যালেঞ্জেরও। এ পর্যায়ে বাংলাদেশের সামনে নতুন নতুন অনেক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আসবে। আর তা মোকাবেলায় কতটা সক্ষম সেটাই বিবেচ্য বিষয়। 

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডেভেলপমেন্টর (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এলডিসি উত্তরণের ঘটনা বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা ও শঙ্কা দু’টোই রয়েছে। তবে সতর্ক থাকলে সম্ভাবনার পাল্লাই ভারি হবে। কতটা সম্ভব সেটা দেখতে হলে অপেক্ষা করতে হবে। 

সিপিডির এক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রায় সব দেশেরই উত্তরণের পর দেখা গেছে, প্রবৃদ্ধিতে পতন ঘটেছে। বিশেষ করে কর আদায়ের পরিমাণ না বাড়লে এ সমস্যা আরও জোরালো হয়।  

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে যে সকল চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়াতে হতে পারে:

সিপিডির মতে, সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হবে রফতানি খাতে। যেসব বাজার বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয় এলডিসি থেকে উত্তরণের পর তা আর থাকবে না। এতে রফতানি প্রতি ১০০ টাকায় আগের চেয়ে সাড়ে ৭ টাকা বেশি দিতে হবে। ফলে তখন প্রতিযোগী সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য উৎপাদনশীলতা বাড়ানো একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এছাড়া আবহাওয়াগত বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে আছে বিশ্ব। সেগুলোকে মোকাবেলা করার বিষয় উঠবে। 

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডাব্লুউটিও) এর মতে বাংলাদেশের বর্তমান রপ্তানি পণ্যের শীর্ষ ১২ টির গন্তব্যে ৭০% পণ্য বাণিজ্য সুবিধার আওতাভুক্ত রয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পরে সে সুবিধা আর থাকবে না এ কারণে বাজারসুবিধা হারিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের।

বাংলাদেশি রপ্তানী পণ্যের ৫৮ শতাংশের গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ১৪ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে। রপ্তানিতে শীর্ষে থাকা ১২ টি পণ্যের প্রথম ১১ টি হচ্ছে পোশাকের বিভিন্ন আইটেম । বাকি ১ টি হচ্ছে চামড়ার জুতা। সব মিলিয়ে পণ্য রপ্তানির ৭৬ শতাংশ এই ১২ টি খাত থেকে আসছে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ৬২ শতাংশের গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন অগ্রধিকার মুলক বাজারসুবিধা (জিএসপি)থাকায় এ বাজারে কোন শুল্ক না দিয়েই বাংলাদেশী পণ্য প্রবেশ করতে পারে । এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের সে সুবিধা আর থাকবে না বাংলাদেশকে এই শীর্ষ ১২ পণ্যের রপ্তানিতে প্রায় ১০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে ইইউ মার্কেটে প্রবেশ করতে হলে । এদিকে পোশাক খাতে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম ইইউর সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করেছে যার ফলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকগণ তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হবেন সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না 

ইইউ এর জিএসপি সুবিধার পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম সেবাটি জিএসপি প্লাস বাণিজ্য সুবিধা। বাংলাদেশ জিএসপি প্লাস এর সুবিধাঅর্জন করার পূর্বেই এলডিসি ভুক্ত দেশ থেকে বাহির হয়ে যাচ্ছে এটা আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের জন্য কারণ যদি কোন দেশ জিএসপি প্লাস সুবিধা অর্জন করে তাহলে জিএসপি প্লাস এর অধীনে ট্যারিফ লাইনের ৬৬ শতাংশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে যার মধ্যে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্য পোশাক ও বস্ত্র রয়েছে।

এই জিএসপি প্লাস সুবিধা অর্জন করতে হলে বাংলাদেশকে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে প্রথম শর্ত হচ্ছে, বাংলাদেশকে ২৭ টি কনভেনশন অনুসমর্থনের ও বাস্তবায়ন করতে হবে যদিও বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ২৬ টি কনভেনশন সই করেছে । দ্বিতীয় শর্ত বাংলাদেশের জন্য সমস্যা নয়। কিন্তু তৃতীয় শর্ত বাংলাদেশের বিপক্ষে রয়েছে সেটি হচ্ছে , ইইউ থেকে এলডিসি ভুক্ত দেশ গুলো যেসব জিএসপি সুবিধা পায় তার ৬.৭ শতাংশের বেশি হিস্যা হলে জিএসপি প্লাসের এর জন্য মনোনীত হবেনা। বাংলাদেশের হিস্যা বর্তমানে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ । তবে আশার আলো হচ্ছে ২০২৪ সালে ইইউ জিএসপি নিয়ে নতুন একটি আইন করতে যাচ্ছে সে আইন কোন পক্ষে যায় এখন সেটা দেখার বিষয় । যদি আইন কিছুটা শিথিল হয় তাহলে বাংলাদেশে হয়তোবা জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে পারে কিন্তু সেটি অনিশ্চিত।

যেহেতু বাংলাদেশ এখনও এলডিসির আওতায় রয়েছে এজন্য বাংলাদেশ কোনও শুল্ক ছাড়াই ইইউ মার্কেট ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, জাপান, তুরস্ক এবং কানাডায় নিজের পণ্য রফতানি করতে পারে।

এছাড়া এলডিসি ভুক্ত বিবেচনায় রাশিয়া এবং বেলারুশ ৭১ টি পণ্যের উপর বাংলাদেশকে তাদের জিএসপি (জেনারেলাইজেশন সিস্টেম অফ প্রিফারেন্স) সিস্টেমের অধীনে শুল্কমুক্ত প্ল্যাটফর্ম সরবরাহ করে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া প্রিফারেন্সিয়াল ট্যারিফ ফর লিস্ট ডেভেলপড কান্ট্রিজের আওতায় ৪,৮২০ টি পণ্য সব স্বল্পোন্নত দেশকে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করছে। একই সাথে চিনও ৮,২৫৬ টি পণ্যে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দিয়ে আসছে।

যখন বাংলাদেশে এলডিসি ভুক্ত দেশ থেকে বাহির হয়ে যাবে তখন এই সকল দেশগুলোর পণ্য রপ্তানি করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে যথাযথ শুল্ক দিয়েই পণ্য রপ্তানি করতে হবে । যার ফলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতে, বাড়তি শুল্কের চাপে পড়ে রপ্তানি আয় ৫৩৭ কোটি ডলার বা ৪৫ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা কমতে পারে যা দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ১৪ দশমিক ২৮ শতাংশ।
এলডিসি ভুক্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যে সুবিধা গুলো পেত সেগুলো অধিকাংশ বন্ধ হয়ে যাবে । এটি বাংলাদেশের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে এবং রপ্তানি খাতে অনেক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

আবার বৈদেশিক ঋণে সহনীয় সুদ ও নমনীয় শর্তও সীমিত হয়ে আসবে।উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে আগের মত সহজ শর্তে বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্য পাবে না বাংলাদেশ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা কোথায় দাঁড়াবে তা বিশ্নেষণের বিষয় । এর ফলে বাংলাদেশকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হবে। এ প্রক্রিয়ার সঠিক সমন্বয় না হলে অভ্যন্তরীণ অর্থ ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়তে পারে।

এলডিসির আওতাভুক্ত হওয়ায় জাতিসংঘের যেকোন প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করার জন্য বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের বিমান ভাড়া জাতিসংঘ বহন করত কিন্তু যখন বাংলাদেশে এলডিসি থেকে বাহির হয়ে যাবে তখন সম্পূর্ণ খরচ বাংলাদেশ সরকারকে বহন করতে হবে।

এলডিসির আওতাভুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশে যে সকল বৈদেশিক সাহায্য ও প্রণোদনা লাভ করত সেগুলো অধিকাংশ বন্ধ হয়ে যাবে।

বিদেশে অধ্যায়নরত যেসকল বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা এলডিসি ভুক্ত দেশের শিক্ষার্থী হওয়ার জন্য বৃত্তির সুযোগ পেত সেগুলো সীমিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে।

সর্বোপরি বলা যায়‌, করোনা পরবর্তী বিশ্ব বাণিজ্যে এলডিসির সুবিধা হারিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

অন্যদিকে সম্ভাবনার জায়গাটি হচ্ছে সামনে সাম্প্রতিক উন্নয়ন ইতিহাসে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ এক অনন্য ঘটনা। কারণ যেসব দেশ এর আগে এলডিসি থেকে বের হয়েছে, তারা ছিল খুব ছোট দেশ। তাদের জনসংখ্যা কম ছিল। উৎপাদনের পরিমাণ কম ছিল। এর তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক বিস্তৃত। তাই চ্যালেঞ্জ থাকলেও সম্ভাবনাও সীমাহীন। সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে এলডিসি উত্তরণের ঘটনা এমন সন্ধিক্ষণের মধ্যে রয়েছে- যখন অর্থনীতির একাধিক উত্তরণ প্রক্রিয়া একসঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। এর মধ্যে আছে, স্বল্প আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্য আয়ের দেশে পা রাখা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন, মধ্য আয়ের দেশ অতিক্রম এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশে যাত্রা। একটা সূচকের সঙ্গে আরেকটা সূচক পারস্পরিক নির্ভরশীল বলে- এলডিসি উত্তরণের ঘটনা অর্থনীতিতে একটা নতুন সুযোগের সৃষ্টি করে দেবে।

পাশাপাশি যেসব সুবিধা ধরা দিতে পারে সেগুলো হচ্ছে- ১. উদ্যোক্তার মধ্যে সৃষ্ট মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। এর ফলে দেশে ছোট-বড় লক্ষাধিক উদ্যোক্তার মধ্যে সনাতনী চেতনার পরিবর্তন ঘটবে এবং সেটি বিশ্বায়নের ঝুঁকি মোকাবেলায় নিরাপদ ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে। এ মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রভাব মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) গতি সঞ্চার করবে। ২. আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি বাড়বে। ইতিবাচক ভাবমূর্তি বিশ্বের যে কোনো দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটায়। ৩. বিশ্বায়নের অবাধ প্রতিযোগিতায় উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার সক্ষমতা বৃদ্ধি ঘটবে। এর কারণ উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশের আগে হাতে থাকা ৯ বছর সময়ে বাংলাদেশের শিল্পপণ্য উৎপাদনে বৈচিত্র্য আচ্ছে।

আরো আসার দিক হচ্ছে ডব্লিউটিও এর মতে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি ৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ বাড়তে পারে তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ও অস্ট্রেলিয়ার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আমাদের করণীয়:

বিশেষজ্ঞদের মতে এলডিসি সুবিধা হারিয়ে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হলে বিশেষ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেমন:

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে গ্রার্মেন্টস ছাড়াও আরো অনেক রপ্তানী পণ্য তৈরি করতে হবে । শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে"।

বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের শুধুমাত্র কয়েকটি রপ্তানিকারক পন্যের উপরে দৃষ্টিপাত না করে রপ্তানির বহুমুখীকরণ করতে হবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ এন্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (আইইপিআইডি) চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক বলেন , এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের আরও সময় নেয়া প্রয়োজন এটিই নিরাপদ রাস্তা।

সিডিপির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন,বাংলাদেশ সরকারকে যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশী পণ্যের প্রধান গন্তব্য দেশগুলোর সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ )করতে হবে যদিও এই প্রক্রিয়াটিকে অনেক দীর্ঘ। এখনো পর্যন্ত ভুটানের সাথে একটি এফটিএ হয়ে গেছে।

লেখক:
মুছা কালিমুল্লা
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

No comments

Powered by Blogger.