ধর্ষণমুক্ত নির্মল সমাজ বিনির্মাণে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে


ধর্ষণমুক্ত নির্মল সমাজ বিনির্মানে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে
বর্তমানে আমাদের সমাজ তথা সম্প্রদায়ের মধ্যে অন্যতম আলোচিত বিষয় হচ্ছে ধর্ষণ। ধর্ষণ আমাদের সমাজে একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি। ধর্ষণ হচ্ছে এক ধরনের যৌন আক্রমণ। সাধারণত, একজন ব্যক্তির অনুমতি ব্যতিরেকে তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম বা অন্য কোনো ধরনের যৌন অনুপ্রবেশ ঘটানোকে ধর্ষণ বলা হয়। ধর্ষণ শারীরিক বলপ্রয়োগ, অন্যভাবে চাপ প্রদান কিংবা কর্তৃত্বের অপব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত হতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে ধর্ষণের ভয়ংকর ছোবল। করোনাকালীন এই মহামারী দূর্যোগ পরিস্থিতিতেও  ধর্ষণ নামক অতীব জঘন্য নিকৃষ্ট কাজ দিন দিন বেড়েই চলেছে। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে তনু, হীরামনিদের তালিকা।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য মতে, গত আগস্ট মাসেই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৪৯ জন নারী ও শিশু। এরমধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩২ জন। সব ধর্ষনের খবরাখবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় নাহ বা সবার সামনে আসে নি। তাই অনেক ধর্ষনের খবর আড়ালেই থেকে যায়।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতি মাসে গড়ে ৮৪টি শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এ ছাড়া এক বছরে যৌন নির্যাতন বেড়েছে ৭০ শতাংশ। গত বছর যৌন নির্যাতনের শিকার হয় ১ হাজার ৩৮৩ শিশু। ২০১৮ সালের চেয়ে গত বছর শিশু ধর্ষণ ৭৬ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ বেড়েছে।

পূর্বের বছরের পরিসংখ্যান ও প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী বলা যায় যে আমাদের দেশে ধর্ষণের হার উচ্চমাত্রিক। ২০২০ সালের ধর্ষণের হার  ক্রমাগত বেড়েই চলেছে এবং ২০১৯ সালকেও ছাড়িয়ে যাবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই বৈকি।

গত ৪ ই অক্টোবর নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুরে যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটা মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। মানুষ রুপী হায়েনারা সেই ধর্ষণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে নির্মম পৈশাচিকতার পরিচয় দিয়েছে।

আমাদের সমাজে ধর্ষণ একটি ভয়ংকর ঘৃণ্য ও বর্বরতম অপরাধ বলে অ্যাখায়িত করা হয়।ধর্ষণের প্রভাব আমাদের সমাজে লক্ষণীয়।ধর্ষণের করালগ্রাসে সমাজে বলতে গেলে নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।নারীরা সমাজে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে ইতস্তত করছে ধর্ষণের ভয়াবহতা বৃদ্ধিতে।একটি মেয়ের অনিন্দ্য  সুন্দর জীবনের করুন পরিনতি ঘটছে  ধর্ষণের কারণে। নারী, মহিলা, বৃদ্ধা ছাড়াও একটি ছোট্ট শিশুও রেহাই পাচ্ছে না ধর্ষণের হিংস্রতা ও বর্বরতা থেকে। যার দরুন একটি ছোট্ট শিশুর  জীবনের বীজ অঙ্কুরিত হওয়ার আগেই অচিরেই বিনষ্ট হচ্ছে ধর্ষণ নামক  নিকৃষ্ট  অপরাধের কারণে। 

ধর্ষণের ঘটনার পেছনের বিভিন্ন কারণ রয়েছে যেমনঃ- অবাধ পর্নোগ্রাফির বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্বল্প পরিচয়ের পর ওই ছেলের সঙ্গে বাছবিচার না করে মেলামেশা, বিভিন্ন চ্যানেল, বিশেষ করে পাশের দেশের বিভিন্ন চ্যানেলে যা দেখানো হয়, তা-ও ধর্ষণের মতো অপরাধকে উসকে দিচ্ছে। ছেলেমেয়েরা ইন্টারনেটে কোন সাইট দেখছে, তা-ও অভিভাবকেরা কখনো নজরে আনছেন না। এছাড়া ধর্মীয় মূল্যেবোধের অভাবও ধর্ষণের কারণ।

ধর্ষিতার পরিবারের উপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ধর্ষণের পর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিবার সামাজিকতার ভয়ে বিষয়টি গোপন রাখতে বাধ্য হয়। সামাজিকগত ভাবে তাদেরকে মানসিক সমর্থনের বিপরীতে মানসিক ভাবে আরো দূরে সরিয়ে দেয়া হয়। নারীদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। নারীদের মৌলিক অধিকার হরণ করা হচ্ছে  ধর্ষণের মাধ্যমে। কেউ কেউ আত্নহত্যার পথ বেছে নিতে পিছপা হচ্ছে না। এছাড়া অনেক বাবা মা ভয়ে  তাদের মেয়েকে বাল্যবিবাহ দিতে বাধ্য হচ্ছে।  ফলে তাদের অনাবিল ভবিষ্যত জীবন নিলীন ও পথভ্রষ্ট হয়ে হার মানছে ধর্ষণের ভয়াবহতার কাছে।

ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের প্রতি প্রতিরোধ ও প্রতিকারে কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া উচিত। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে। আমাদের দেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে যাব্বজীবন কারাদন্ড। অতিদ্রুত সংবিধানে পরিবর্তন আনতে হবে ধর্ষণের শাস্তির বিষয়ে।ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত মৃতুদন্ড। ধর্ষককে দৃষ্টান্তমূলক সাজার আওতায় আনতে হবে। ২০০৩ সালে সংশোধিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের বিচারে যে সময় নির্ধারণ করা আছে, সেই সময়ের মধ্যেই তা শেষ করতে হবে। আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকে সঠিকভাবে তদন্ত গ্রহন এবং ধর্ষিতার পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল ও মানবিক আচরণ করতে হবে। সরকারসংশ্লিষ্ঠ মন্ত্রনালয়কে দলমত নির্বিশেষে ধর্ষকদের কঠোরভাবে দমন করতে হবে।

সর্বোপরি পারিবারিক, সামাজিক,রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্ষণকে প্রতিরোধ ও সমাজ থেকে বিলীন করতে  সামাজিক জনসচেতনতাবোধ জোরদার ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া অত্যন্ত জরুরী।

মোদ্দাকথা ধর্ষণমুক্ত একটি সুন্দর নির্মল সমাজ বিনির্মানে আমি, আপনি, আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই জন্ম হবে সুশোভিত এক মানবিক বোধ সম্পন্ন পৃথিবীর।

লেখক:
শাহ মুনতাসির হোসেন মিহান
শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

No comments

Powered by Blogger.