নব জীবনের সন্ধানে --ফরহাদ হোসেন


নব জীবনের সন্ধানে --ফরহাদ হোসেন সিআরপি সাভার

[আজ বিশ্ব অকুপেশনাল থেরাপি  দিবস।পক্ষাঘাতগ্রস্তদের সেবা প্রদান ও পুনর্বাসন এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছে অকুপেশনাল থেরাপিস্টটগণ। এই দিবসে জানাই অকুপেশনাল  থেরাপিস্টদের বিনম্র শ্রদ্ধ। ভালোবাসা রইলো তাদের প্রতি। ফরহাদ হোসেন এর লেখা গল্পটিতে রয়েছে অকুপেশনাল থেরাপি এবং অকুপেশনাল থেরাপিস্ট সম্পর্কে কিছু কথা।আশা করি পাঠকদের ভালো কিছু ধারণা দিবে গল্পটি]

 নব জীবনের সন্ধানে  

রেনার পাশে বসে আছি। ওর হাতের উপর আমার হাত রেখেই বসে আছি।ডাক্তার সাহেবের সাথে কথা হয়েছে।আজ রেনাকে বাসায় নিয়ে যেতে পারবো। গত নয়দিন যাবৎ রেনা হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে।

রেনা আমার স্ত্রী। ওর নাম রেহেনা।আমি আদর করেই রেনা বলে ডাকি।বিয়েটা পারিবারিক ভাবে হলেও ওর সাথে আমার পরিচয় পূর্ব থেকেই। মায়ের বান্ধবীর মেয়ে।সেই সুবাদে কয়েকবার দেখার সুযোগ হয়েছিলো আগে কিন্তু দুই-তিনবারের বেশি কথা হয়নি।বিয়ের প্রথম দুয়েক মাস ওর প্রতি আমার আগ্রহ ছিলো না।কিন্তু এখন রেনাকে ছেড়ে কোথাও একবেলা কাটাবো তা ভাবতেই পারি না।মেয়েটা অনেক মায়াবী।চোখের দিকে তাকালে আমি ভুলেই যাই পৃথিবী বলে একটা জগৎ আছে।তার কথা বলার সময় মুগ্ধ হয়ে শুনা ছাড়া কিছুই করতে পারি না। কথা বললে মনে হয় কলকল করে পানি গড়িয়ে পড়ছে।যেকোনো শাড়ি পরলেই রেনাকে বেশ মানায়।আমার কাছে যদি পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর উপহার এনে দিয়ে বলে এর থেকে সুন্দর কিছুই হতে পারে না আমি মেনে নিবো না।কারণ রেনার থেকে ওই সকল সৌন্দর্য আমার মন কেড়ে নিতে পারবে না।ভালোবেসে ফেলেছি মেয়েটাকে।রেনা যে অবস্থায় যেভাবেই থাকুক না কেন আমার ভালোবাসার কমতি হবে না একটুও।

গত নয়দিন রেনাকে ছেড়ে একটা রাতও কোথাও থাকিনি।সম্ভবত এই নয়দিনে পনেরো ঘন্টাও ঘুমাইনি।রেনা রাতে দিনে ব্যাথায় কোঁকিয়ে উঠতো। ডাক্তার বলেছেন হেড ইনজুরি হয়েছে। ওর বাঁ হাতের অনুভূতি শক্তি নেই।হাতের স্নায়ুগুলো কাজ করে না। পায়ের স্নায়ুগুলোও অনেক দুর্বল হয়ে গেছে।যদি পায়ের আঘাত আরেকটু বেশি হয়ে যেতো তাহলে রেনা আর দাঁড়াতে পারতো না।এখনো রেনাকে সাবধানে চলাচল করতে হবে।

সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছি।হাসপাতালের সকল বিল পরিশোধ করা শেষ। রেনাকে একটা হুইলচেয়ার এ বসানো হলো।হুইলচেয়ারে বড্ড বেমানান রেনাকে।ও হাটবে, ঘুরবে এতেই মানায় মেয়েটাকে।আমার চোখে পানি আসেনি।কিন্তু মনটা কোঁকিয়ে উঠেছে।রেনা আমার দিকে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।আমি হুইলচেয়ারের হাতল ধরে হাটতে শুরু করলাম।

রেনা এখন আর বাথরুমে যেতে চায় না।খুব ভয় পায়।এই বাথরুমই যে তার এই অবস্থা করেছে।সেদিন গোসল করতে গিয়েছিলো রেনা।আমি রুমে বসেই টেলিভিশনে নিউজ দেখছিলাম।অনেক্ষন যাওয়ার পরেও যখন রেনা বের হচ্ছে না তখনই আমার টনক নড়ে।আমি দরজার কাছে এসে ডেকেছিলাম তাকে কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি।

আমার মনে ভয় লাগা শুরু হয়ে গেছে।অনেক কষ্টে দরজা ভেঙ্গে দেখি রেনা উপুড় হয়ে পড়ে আছে।জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলো।তবে শ্বাস চলছিলো।

পাশের রুম থেকে রেনা ডাকছে।তার কাছে গিয়ে বসলাম।ওর চোখ ভিজা ছিলো।কেঁদেছে যে বুঝে ফেলেছি।বললাম,"বোকা মেয়ে কাঁদছো কেনো?আমি পাশে আছিতো নাকি।তুমি যেমনই হও না কেনো ছেড়ে যাবো না তোমায়"।

ওর কান্না বেড়েই চলেছে।আমি বললাম,"এইবার কিন্তু চলে যাবো যদি কান্না করো।কান্না থামাও দয়া করে।"ও চুপ করে গেলো।বললো,"খাওয়া দাওয়া করোনি ঠিক মতো এতদিন।ঘুমাওনি ঠিক মতো।চোখের নিচে কালচে দাগ পড়ে গেছে তোমার।"বলেই আবার কান্না শুরু করলো।আমি ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললাম,"আমি ঘুমালে আমার রেনার দেখাশুনা করবে কে শুনি?আমার রেনাকে তো সুস্থ হতে হবে নাকি?"

রেনা উঠে বসতে চাইলো।তাকে ধরে বসালাম।রেনা আমার দিকে তাকিয়ে বললো,"পাশে থাকো কিছুক্ষন।আমি তোমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাই একটু।"

আমি ওর পাশে গিয়ে বসলাম।ওর মাথা আমার কাঁধে রেখে শুয়ে আছে।কিছুক্ষন চুপ করে থাকার পর হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো,"আমি কি বাঁ হাত দিয়ে কাজ করতে  পারবো না?" ও চুপ হয়ে গেলো।আমার দিকে তাকালো একটু।ওর চাহনির দিকে অনেক আশা ছিলো খেয়াল করলাম।

আমি বললাম,"পারবে গো পারবে।আবার এই দুই হাত দিয়ে সুস্বাদু খাবার রান্না হবে।অনেক দিন হলো তোমার হাতের তৈরি খাবার খাই নি।অন্যের রান্না খেতে খেতে মুখের স্বাদ চলে গেছে।"

ও এইবার একটু মুচকি হাসলো।বললো,"ওরে আমার প্রিয় স্বামীটার কি কষ্ট! দেখেছো এইবার বউয়ের হাতের যাদু।"

বিকেলে আমি দু কাপ চা বানিয়ে বারান্দায় বসে রেনার সাথে গল্প করছিলাম।মাঝ পথে ছোট মামার কল আসলো।কলটি রিসিভ করলাম।

"আস্-সালামু আলাইকুম,মামা।"

"ওয়ালাইকুমস্-সালাম।বউমার শরীরের কি অবস্থা বল্।"

"আছে মামা আগের থেকে সুস্থ। "

"আচ্ছা শোন্।আমার এক বান্ধবী আছে।একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট। সি.আর.পি-সাভারে চিকিৎসা প্রদান করে। ওর সাথে যোগাযোগ কর।আমি আগেই সব কথা বলে রেখেছি।আমি নাম্বার পাঠিয়ে দিচ্ছি।আশা করি বউমা পরিপূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবে।"

আমি কথাগুলো শুনছিলাম।বললাম,"আচ্ছা মামা, পাঠিয়ে দিন।আমি কথা বলে নিবো।"রেনা আমার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।ওর জিজ্ঞাসার আগেই বললাম,"বলছি তোমায়, অপেক্ষা করো।"

কিছুক্ষণ পর মোবাইলে ম্যাসেজ আসলো।মামা নাম্বার পাঠিয়েছেন।কল দিলাম উক্ত নাম্বারে।

ওপাশ থেকে, "আস্-সালামু আলাইকুম।নূর নাহার বলছি।"

"ওয়ালাইকুমস সালাম।আপনি সি.আর.পি সাভার থেকে বলছেন না?"

"হ্যাঁ, সি.আর.পি-সাভার থেকে"

"আমি জহির হোসেন।বেলাল আহমেদ আমার মামা।আপনার সাথে যোগাযোগ করতে বললেন।"

"হ্যাঁ, হ্যাঁ। চিনতে পেরেছি।জহির সাহেব আমি আপনার বিষয়টি জানতে পেরেছি।দয়া করে আপনি আপনার স্ত্রীকে নিয়ে আমাদের এখানে আসুন।মোবাইলে সব কিছু বলা যায় না।আর বললেও বুঝবেন না।"

"ঠিক আছে।আমরা আগামীকালেই না হয় আপনার সাথে সাক্ষাৎ করি।"

"কেনো নয়।আপনি কাল আসুন।"

সালাম দিয়ে কল রেখে দিলাম।রেনা এখনও আমার দিকে তাকিয়ে।বললাম,"আমরা আগামীকাল একজন থেরাপিস্ট এর সাথে দেখা করবো।সেখানে তোমার ট্রিটমেন্ট হবে।আশা করি তোমার হাতের রান্নাটা আবার খেতে পারবো কিছু দিনের মধ্যে। "

রেনা কিছুটা হলেও আশা পেলো।আগ্রহের স্বরে বললো,"সত্য বলছো তো,আমি আবার সব কিছু করতে পারবো?"

বললাম," হ্যাঁ,আমার বউটি শীঘ্রই সুস্থ হয়ে উঠবে।"

পরদিন সকালে শাহবাগ থেকে সাভারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। মামার প্রাইভেট কার বাসার সামনে এসে গেছে।রেনার বাসে চড়তে অসুবিধে হবে বলেই মামাকে বলা।প্রায় দুই ঘন্টা পর সি.আর.পি গেইটে পৌঁছালাম। গেইটের ঠিক উপরেই বড় করে লিখা,"পক্ষাঘাতগ্রস্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র (সি.আর.পি)"গেইটে নাম এন্ট্রি করে ভিতরে প্রবেশ করলাম।খুবই গুছানো, পরিপাটি পরিবেশ। কোথাও যেন একটু ময়লাও নেই।নূর নাহার ম্যাম কে কল দিলাম।ওনি গাড়ি পার্কিং এর জায়গায় আসতে বললেন।গাড়ি পার্কিং-এ নামলাম।রেনা ভিতরেই বসে আছে।রোগীর ভিড় চোখে পড়ার মতো।হুইলচেয়ারেই অধিকাংশের চলাচল। খেয়াল করলাম অনেকেই অচল পা দিয়ে অভিনব কায়দায় কাজ করছে,চমৎকার ভাবে হাটছে।একটু সামনে এগুতেই একজন মধ্যবয়সী ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন,"আপনি কি জহির সাহেব?"আমি বললাম,"হ্যাঁ আমি।"লোকটি বললেন,"আমার সাথে আসুন রোগীকে নিয়ে।রোগী কি হাটতে পারে?"আমি বললাম,"অসুবিধে হয় একটু।"

"আচ্ছা,আমি হুইলচেয়ার নিয়ে আসতেছি।দয়া করে একটু অপেক্ষা করুন।"

"প্রয়োজন নেই।হুইলচেয়ার নিয়ে এসেছি।আপনি বরং নামাতে সাহায্য করুন।"

রেনাকে নামানো হলো গাড়ি থেকে।হুইলচেয়ারে বসানো হলো।লোকটি হুইলচেয়ার বয়ে নিচ্ছেন।আমি পাশাপাশি হাটছি।দেখলাম একটা কক্ষের দিকে যাচ্ছেন।দরজার উপরে লিখা অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগ।কক্ষে প্রবেশ করলাম।কক্ষটি কয়েকটি উপকক্ষে ভাগ করা পর্দা দিয়ে।খেয়াল করলাম প্রতিটি কক্ষেই রোগী ছিলো।প্রত্যেকের সামনেই একজন করে থেরাপিস্ট। মাঝখানে বড় একটি টেবিল রাখা।এখানেও রোগী রয়েছে।আমায় দেখে একজন ত্রিশ কি বত্রিশ বয়স্কা ভদ্র মহিলা এগিয়ে আসলেন।গায়ে অ্যাপ্রোন পরা।বুঝতে পারলাম উনিই নূর নাহার ম্যাম।ওনি আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন।

নূর নাহার ম্যাম বললেন,"বসুন এখানে(চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করে)।"

একটি চেয়ারে রেনাকে বসিয়ে আমিও পাশের চেয়ারটিতে বসে পড়লাম।নূর-নাহার ম্যাম রেনার দুই হাত টেবিলের উপর রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করলেন , "অসুবিধা হয়নি তো আসতে?"

"নাহ,রাস্তা ফাঁকাই ছিলো।ঠিক মতোই আসতে পেরেছি।"

"জহির সাহেব,বাথরুমের কোথাও কোনো সমস্যা আছে কিনা খেয়াল রাখবেন না?পিছল ছিলো পরিস্কার করে রাখা উচিত ছিলো। "

আমি চুপ করে রইলাম।তিনি আবার বললেন,"আপনারা আসবেন তাই রিসিপশন থেকে আপনাদের সিরিয়াল দিয়ে রেখেছিলেন আপনার মামা।"

ম্যাম পয়সার মতো দেখতে একটা সেন্সরি টোলস্ রেনার হাতের উপর রেখে ওর উদ্দীপনা জানতে চাইলো রেনার কোনো অনুভূতি ছিলো না বাঁ হাতের। নূর নাহার ম্যাম আমার দিকে তাকিয়ে কিছু ইনফরমেশন জানতে চাইলো।যাকে আমরা অ্যাসেস্-মেন্ট বলি।একটি নোটপ্যাড এ অনেক তথ্য লিখে রাখলেন।পারিবারিক, আর্থিক,বাসার পরিবেশ সহ অনেক কিছু।এসব প্রশ্ন সম্ভবত কোনো ডাক্তার করে না।ওনি যতই প্রশ্ন করছে মনে হচ্ছে ওনি আমাদের পরিবারের একজন যে খেয়াল রাখতে চাচ্ছে সব কিছু।

আমার এই চিকিৎসা সম্পর্কে ভালো ধারণা নেই।তাই কৌতূহল মেটাতেই প্রশ্ন করে বসলাম,"আপনাদের চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে আমায় জানাবেন কি দয়া করে?"

ভদ্রমহিলা একটু হাসলেন।বললেন,"ভালো প্রশ্ন করেছেন আপনি।আমি আপনায় বর্ণনা  দিচ্ছি।আশা করি বুঝতে পারবেন।রেহেনা তুমিও শুনো(রেনার দিকে তাকিয়ে)।"

"প্রথমত সকলের যে প্রশ্ন মাথায় আসে সেটা হলো থেরাপি কী?থেরাপি হলো একটি মেডিকেল ট্রিটমেন্ট। যদি কোনো ব্যাক্তির শারীরিক বা মানসিক সমস্যা হয় সেই সমস্যাটি নির্ণয় করে উক্ত সমস্যার সমাধান দেওয়াই হলো থেরাপি।এই থেরাপি কয়েক ধরনের হয়ে থাকে সাধারণত। ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ থেরাপি, রেডিও থেরাপি,প্লাজমা থেরাপি সহ অনেক ধরনের।রিহ্যাবের ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ থেরাপি সেবা দেওয়া হয়।আপনি এখন অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগে আছেন।এখন এই চিকিৎসার বর্ণনা দেই।অকুপেশনাল থেরাপিস্টগন অটিজম, বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা, মস্তিষ্কের পক্ষাঘাত, স্নায়ুরোগ, মেরুরজ্জুতে আঘাত, হাড় ও মাংশপেশীর সমস্যা সহ বিভিন্নধরনের মানসিক রোগের চিকিৎসা প্রদান করে থাকেন। পাশাপাশি তিনি যেনো পূর্বের কাজে অভ্যস্ত বা তার দক্ষতা আছে এমন কাজে অভ্যস্ত করে তোলা এবং মানসিক ভাবে উন্নতি প্রদান করাই হলো অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের কাজ।আরেকটু সহজ করে বলি।আপনার স্ত্রীর বাঁ হাতে সমস্যা।তিনি সেই হাত দিয়ে কাজ করতে অক্ষম।এইটা তার শারীরিক সমস্যা।এই সমস্যার কারণে আবার তিনি বিষন্নতায় ভুগছেন।যাকে মানসিক সমস্যা বলি।একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট আপনার স্ত্রীকে থেরাপি বা চিকিৎসা প্রদান করে তাকে শারীরিক ভাবে সুস্থ করে তুলতে এবং তিনি যেনো এই হাত দিয়ে পূর্বের ন্যায় কাজ করতে পারেন পাশাপাশি মানসিক ভাবে তিনি যেনো ভেঙ্গে না পরেন সেই লক্ষ্যেই কাজ করবেন।পাশাপাশি একজন অটিজমের শিশুর মানসিক সমস্যার সমাধান সহ মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট। একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট রোগীকে তার সর্বোচ্চটাই দিতে চেষ্টা করে। আশা করি বুঝতে পেরেছেন।"

আমি মনযোগ দিয়ে ওনার কথা শুনছিলাম।ওনার কথা গুলো নতুন লাগলেও এই চিকিৎসার প্রতি ভালো লাগা শুরু হয়ে গেছে।বললাম,"তাহলে আপনি রেহেনার চিকিৎসা শুরু করে দিন।কেমন সময় লাগবে?"

"আমরা দুটি গোল বা লক্ষ্য ঠিক করেই চিকিৎসা সেবা শুরু করি।একটি লং-টার্ম গোল অপরটি শর্ট-টার্ম গোল।আপনার স্ত্রীর ক্ষেত্রে মাস দুয়েক সময়তো লাগবেই।"

এইবার আমার চিন্তিত হবার পালা।বুঝতে পারলাম দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা। কিন্তু দুই মাস আমরা কই থাকবো?কিভাবে থাকবো চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়ে গেলো।নূর নাহার ম্যাম বিষয়টি লক্ষ্য করলেন।বললো,"জহির সাহেব,কপালে ভাঁজ হলে যে বরং!চিন্তায় পড়ার কিছু নাই।আমাদের আবাসিকের ব্যাবস্থা আছে।"

আবাসিকের কথা শুনে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। রেনার জন্য এই দুই মাস না হয় একটু কষ্টই করলাম।

নূর নাহার ম্যাম বললো,"চলুন পরিবেশটা ঘুরে দেখে আসি।আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে।"

ওনি মধ্যবয়স্ক ঐ ভদ্র লোককে ডাকলেন এবং ইশারায় হুইলচেয়ার বয়ে আনতে বললেন।আমরা বাহিরে হাটছি।রেনাও সাথে আছে।যতক্ষন পর্যন্ত ঘুরলাম বেশ ভালো লাগছিলো।নূর নাহার ম্যাম আমাদের সবকিছুই চিনিয়ে দিলেন।সবথেকে বেশি অবাক হই বাস্কেটবল গ্রাউন্ডে এসে।পাঠকগণের মধ্যে কেউ হয়তো মোবাইলে বা সরাসরি দেখেছে।কিন্তু আমি এই প্রথম ওই দেখি প্রতিবন্ধী ব্যাক্তিরাও হুইলচেয়ারে বসে বাস্কেটবল খেলতে পারে।তাদের খেলার কৌশল দেখে যেকোনো সাধারণ ব্যাক্তি অভিভূত হবেন আমি কথা দিচ্ছি।ব্যাক্তিদের হুইলচেয়ার সঞ্চালনের অভিনব কৌশল আমায় বরাবরই মুগ্ধ করেছে।পাঠকগণের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ থাকবে যখন আপনারা জীবন নিয়ে হতাশায় ভুগবেন অবশ্যই কিছু সময়ের জন্য হলেও সি.আর.পি ঘুরে আসবেন।আপনার জীবন যে শেষ হয়ে যায় নি তা উপলব্ধি করবেন সি.আর.পি-তে।

পরদিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে সাভারের উদ্দেশ্যে বের হলাম।দুজনের মনেই ছিলো একগুচ্ছ স্বপ্ন।এক রাশ স্বপ্ন নিয়েই সাভারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।

প্রায় দেড় মাস চিকিৎসা চলেছিলো রেনার।এখন রেনার বাঁ হাত সম্পূর্ণ সতেজ।সে হাত নাড়াচাড়া সহ পূর্বের ন্যায় সকল কাজ করতে পারে।রেনার বিশ্বাস ছিলো সে সম্পূর্ণ সুস্থ হবে।থেরাপিস্টদের দেওয়া সকল নিয়মাবলি সঠিক ভাবে পালন করে রেনা।যার ফলশ্রুতিতে দেড় মাসেই পরিপূর্ণ সুস্থ হয়ে আজ বাসায় যেতে পারবে।সি.আর.পির প্রতিটি মুহূর্তকেই আমি আর রেনা উপভোগ করেছি।

আজ রেনা বাসায় যাবে।থেরাপিস্টদের নিয়ে ছোট একটি বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।অনেকটাই আনন্দের ছিলো বিদায় মুহুর্তটি।কথা দিয়ে এসেছি প্রতি মাসে একবার হলেও আমি আর রেনা সি.আর.পি ঘুরে আসবো।

সকলের থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম।ড্রাইভারকে অতি ধীরেই সি.আর.পি প্রাঙ্গণ ত্যাগ করতে বললাম।রেনা আমার কাঁধে ওর মাথাটা রাখলো।আমি আমার হাত দিয়ে রেনার হাতটি শক্ত করে ধরলাম।

লেখক:

ফরহাদ হোসেন

শিক্ষার্থী

অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগ  

No comments

Powered by Blogger.