৫ টুকরো লাশ এবং মায়ের প্রতি নির্মমতা !

৫ টুকরো লাশ এবং মায়ের প্রতি নির্মমতা !

চরাঞ্চল! শুন সান নিরবতা, চারদিকে বিশাল ধানী জমি। ভিতরে ঢুকলে শুধু মাথা দেখা যায়। সংবাদ পেলাম মাঠের মাঝখানে একটি মানুষের মাথা পাওয়া গেছে। বিষয়টি ওসি স্যারসহ থানার সকল অফিসার ও ফোর্সের মধ্যে নাড়া দিল। দলবলে সবাই ঘটনাস্থলে যাই। এরই মধ্যে অনেক মানুষের অানা গোনা। একটি মহিলার মাথা পাওয়া যায়। কিন্তু কেউ লাশ চিনতে পারল না।

হঠাৎ এক লোক বয়স অনুমান ২৭ হবে, চিৎকার দিয়ে বলে এটা আমার মায়ের মাথা। লোকটা তখনও লাশ দেখেনি। এরই মধ্যে টিভি চ্যানেল গুলো তার সাক্ষাতকার নেয়া শুরু করল। সেও দোষ চাপিয়ে মায়ের হত্যার বিচার চাইতে লাগল। রহস্য ঘনীভূত হতে থাকে। পুলিশ ও জনতা মিলে মাঠে ধানী জমিতে লাশের অন্যান্য অংশ খুঁজতে থাকি, হাঁটু থেকে নাভী পর্যন্ত অারো একটি অংশ পাওয়া গেল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে অাসে। লাশের টুকরো গুলো একটি বাড়িতে তুলা হয়। যথারীতি লাশের সুরতহাল প্রস্তুতসহ অানুসঙ্গিক কাজ করতে রাত ১০ টা বেজে যায়।

অনুসন্ধান করলাম, কোন তথ্য পেলাম না। পরদিন ভোর হতে অাবার অনুসন্ধান শুরু। পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সার্কেল স্যারসহ উধ্বতন কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেন। মাঠে ধানী জমি সার্চ করে লাশের ২ টি পা, বডির অংশ, ১ টি কোদাল পাওয়া যায়। অাবারে সুরতহাল। লাশ ময়না তদন্তে প্রেরণ। মৃত মহিলার স্বামী দুই বিয়ে করেন, ঐ ঘরের ছেলে মেয়ে অন্য জায়গায় বসবাস করে, মহিলার অাগে অন্য জায়গায় বিয়ে হয়, ঐ ঘরের একটি ছেলে নাম বেলালসহ পরে বিয়ে হয়, বেলাল মারা যায় বছর খানেক হবে। বর্তমানে মহিলার ঘরে ২ ছেলে, বড় ছেলের স্ত্রী, নাতি অাছে। ছোট ছেলে বিয়ে করেনি। তাদের জিজ্ঞাসা করি। কথাবার্তা এলোমেলো মনে হল। তাদের ভিতর মা হারানোর শোক দেখা যায়নি। জোরালো ভাবে মায়ের হত্যার বিচার চাইলো।

বড় ছেলে বাদি হয়ে থানায় মামলা করল অজ্ঞাতনামা অাসামী করে। শুরু হল তদন্ত। ব্যাপক অনুসন্ধান। বিভিন্ন সূত্র পাওয়া যায়। কিন্ত বিশ্বাসযোগয় সূত্র পাওয়া যায়নি। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষসহ ডিবি পুলিশ অনুসন্ধানে নামেন। প্রযুক্তির ব্যবহার করা হল। কিন্তু কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। খুনিরা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথার। পুলিশের অাশে৷ পাশেই কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাহিরে। শুরু হল পুলিশি কৌশল। ব্যাপক তৎপরতা। ব্যাপক অনুসন্ধান। ঐ এলাকার কসাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হল। তার সহযোগীকে চিহ্নিত করা হল। বাদির বন্ধুদের চিহ্নিত করা হল। একে একে সবাই কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হল। অাশে পাশের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হল। কিন্তু ফলাফল শুন্য।

ঐ মহিলা অত্যন্ত গরিব। মানুষের বাড়ীতে কাজ করে।   পেলে খায়, না পেলে মানুষের কাছে হাত পাতে। বড় ছেলে স্ত্রী নিয়ে অালাদা থাকে। এই অসহায় মহিলাকে কে খুন করবে। কারো সাথে কোন বিরোধ নেই। মহিলার ছেলে বেলাল অনেক টাকা ঋন রেখে মারা যায়। কিন্তু পাওনাদারই বা মারবে কেন। হতাশ হই সবাই, কিন্তু হাল ছাড়েন নি তদন্তকারী অফিসারসহ তদন্ত টিম। শুরু হয়। চতুর্মাত্রিক তৎপরতা। যুক্ত হয় সিনিয়র অফিসারদের দিক নির্দেশনা। খুঁজে বের করা হয় বাদির বন্ধুদের। জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় কিন্তু নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। চালানো হয় গোপন তৎপরতা ও নজরদারি। 

অতঃপর বাদির বন্ধুকে নেয়া হয় হেফাজতে। চালানো হয় দফায় দফায় ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ। বেড়িয়ে অাসে থলের বিড়াল। বাদিই ঘটনার মূল হোতা। কি নির্মমতা? ভাবা যায়? নিজের পেটের সন্তান, যাকে দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করেছে। কত কষ্ট করে লালন পালন করেছে। সেই কিনা নিজ মায়ের খুনি!

মহিলার স্বামী মারা যাওয়ার সময় তার দুই ছেলের নামে ১৩ শতক করে ২৬ শতক জায়গা লিখে দেন। বাকি ২৪ শতক জায়গা মহিলার নামে লিখে দেন। ছেলে বেলাল অনেক টাকা ঋনী। চেয়েছিল কিছু জমি বিক্রয় করে ছেলের ঋন শোধ করবে। এটিই কাল হল অসহায় মায়ের। ছেলে পরিকল্পনা করে বন্ধুদের নিয়ে মায়ের লাশ টুকরো টুকরো করে পঞ্চ খন্ড করে লাশ গোপন করতে  বিলের ধানী জমিতে ফেলে দেয়। কেটে ফেলা হয় তার স্তনও। অন্যকে ফাঁসানোর জন্যও ব্যাপক চল-চাতুরীর অাশ্রয় নেয়। কি নির্মমতা!কি নির্মমতা!! ভাবা যায়? ঘটনা সংক্ষিপ্ত। ঘটনাটি চরজব্বর থানাধীন ০১নং ইউনিয়নের জাহাজমারা গ্রামের সাম্প্রতিক কালের।

সালাউদ্দিন মাসুদ

সাব ইন্সপেক্টর, বাংলাদেশ পুলিশ

No comments

Powered by Blogger.