প্রয়াত ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের অভাব অপূরনীয়!

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক মানেই আইনের এক উজ্জ্বল বাতিঘর। গত শনিবার সকাল ৮ টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে এই বর্ষীয়ান আইনজীবী তার আইনের উজ্জ্বল বাতিটি নিবু নিবু করে নিবিয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

প্রায় এক সপ্তাহ ধরে আদ দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছিলেন তিনি। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কয়েকদিন আগে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয়। তার মৃত্যুতে এ জাতি এক অকৃত্রিম অভিভাবক কে হারালো।

রফিক-উল হক ২ নভেম্বর ১৯৩৩ সালে কলকাতার সুবর্ণপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মুমিন-উল হক ছিলেন চিকিৎসক ও মা নূরজাহান বেগম। তার বাল্যকাল কলকাতায়। কলকাতা চেতলা স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু। ১৯৫৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, ১৯৫৭ সালে দর্শন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং ১৯৫৮ সালে  এলএলবি অর্জন করেন।তিনি ১৯৬১ সালে যুক্তরাজ্য থেকে ব্যারিস্টার (বার-এট-ল) ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬২ সালে লিংকনস ইন -এ ডাক পান। তার পিতা মুমিন উল হক। তার স্ত্রী ফরিদা হক ডাক্তার ছিলেন। ১৯৬০ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তারা।

রফিকুল ১৯৬০ সালে কলকাতা উচ্চ আদালতে আইনজীবী হিসেবে বারের সদস্য হন।  ১৯৬২ সালে তিনি ঢাকা উচ্চ আদালতে যোগদান করেন এবং ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে অ্যাডভোকেট হিসাবে ভর্তি হন। ১৯৭৩ সালে আপিল বিভাগে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন তিনি। ১৯৭৫ সালে তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে সিনিয়র আইনজীবী হিসাবে যোগদান করেন।  ১৯৮৯-১৯৯০ সালে তিনি বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। 

২০০৬-০৮ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কটের সময় তত্কালীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপার্সন ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার অভিযোগ আনা হয়। ওইসময় তিনি তাদের দু’জনের পরামর্শক ছিলেন। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বিপুল অবদান রেখেছেন। তিনি সংবিধান সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ দিতেন।

অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ও খ্যাতিমান আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক উল হক। গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি বিষয় নিয়ে তিনি আদালতকে সবসময় সহযোগিতা করেছেন। সর্বজন শ্রদ্ধেয় এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যারিস্টার রফিক উল হক একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলেন। আইনের শাসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তার অবদান অনস্বীকার্য। তার মৃত্যুতে দেশের আইন অঙ্গনে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো। বাংলাদেশের আইন পেশায় তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বিভিন্ন সময় তিনি ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৫ সালে তিনি সুবর্ণ ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেন। আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাসহ ঢাকা শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায়ও তার ভূমিকা আছে।

বারডেম হাসপাতালের একটি বিশেষ বিভাগ তৈরিতে বড় অঙ্কের অনুদান দেয়ার পাশাপাশি নিজ উদ্যোগে ঢাকার বাইরে কয়েকটি সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। এছাড়া ঢাকার আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালের জন্যও তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করেছেন।

সকল হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এই বর্ষীয়ান আইনজীবী। রফিকুল হক কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত ছিলেন না। সব ধরণের রাজনীতি থেকে নিজেকে আলাদা রাখার কারণেই সব দল ও মতবাদের মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল।

১৯৯০ সালের ৭ এপ্রিল থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাস্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রফিক উল হক। এসময়ে তিনি কোনও সম্মানী নেননি। পেশাগত জীবনে তিনি কখনও কোনও রাজনৈতিক দল করেননি। তবে নানা সময়ে রাজনীতিবিদরা সবসময় তাকে পাশে পেয়েছেন। ব্যারিস্টার রফিক উল হক তার জীবনের উপার্জিত অর্থের প্রায় সবই ব্যয় করেছেন দেশের মানুষের কল্যাণ ও সমাজসেবায়।

তার এই চলে যাওয়াতে শুধু আইনজীবী অঙ্গনেই নই সমগ্র দেশে সকল শ্রেনির মানুষের অঙ্গনে শোকের ছায়া বইছে। শত আইনজীবী, অ্যার্টনি জেনারেল আসবে কেউ রফিকুল হকের মতো হতে পারবে না। তার অভাব অপূরনীয়।


লেখকঃ

তাসফীর ইসলাম (ইমরান)

শিক্ষার্থী, সার্ভে ইঞ্জিনিয়ারিং

বাসাই, imran187619@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.