জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ঃ ছোট ক্যাম্পাসের লম্বা ইতিহাস


জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ঃ ছোট ক্যাম্পাসের লম্বা ইতিহাস
ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংহতির ধারক-বাহক পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি)। সাড়ে সাত একরের এই ছোট ক্যাম্পাসের রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। যা জবিয়ানদের গর্ব। উপমহাদেশের প্রথম দিকের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। এটি প্রায় ১৬২ বছর পূর্বে রাজা রামমোহন রায়ের ব্রাক্ষ্ম সমাজের জন্য ঢাকা ব্রাক্ষ্ম স্কুল নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পুরান ঢাকার এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি জগন্নাথ কলেজ নামেই বিংশ শতাব্দীর অধিকাংশ সময় জুড়ে পরিচিত ছিল। ১৮৭২ সালে বালিয়াটি জমিদার কিশোরী লাল রায় চৌধুরী তার বাবার নামে জগন্নাথ স্কুল নামকরণ করেন। ব্রাহ্ম আন্দোলনের নেতা দীননাথ সেন, অনাথবন্ধু মৌলিক, পার্বতী চরণ রায়, ব্রজসুন্দর মিত্র প্রমুখের ঐকান্তিক চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় এই স্কুল। ১৮৮৪ সালে এটি দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজে ও ১৯০৮ সালে প্রথম শ্রেণির কলেজে পরিনত হয়। এ সময় এটিই ছিলো ঢাকার উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলে জগন্নাথ কলেজে স্নাতক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গ্রন্থাগারের বই-পুস্তক, জার্নাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার জগন্নাথ কলেজ গ্রন্থাগারের ৫০ ভাগ বই দান করা হয়। জগন্নাথ কলেজে আইএ, আইএসসি, বিএ (পাশ) শ্রেণি ছাড়াও ইংরেজি, দর্শন ও সংস্কৃতি অনার্স ও ইংরেজিতে মাস্টার্স চালু করা হলেও ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চালু হওয়ার পর তা বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে ইন্টারমিডিয়েট কলেজে অবনমিত করা হয় জগন্নাথ কলেজকে। পুরান ঢাকার নারী শিক্ষায় বাধা দূর করতে ১৯৪২ সালে সহশিক্ষা চালু করা হয়। পরে ১৯৪৮ সালে তা বন্ধ ও করে দেয়া হয়। এরপর ১৯৪৯ সালে এ কলেজে আবার স্নাতক পাঠ্যক্রম শুরু হয়। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মোহাম্মাদ রফিকউদ্দিন (ভাষা শহীদ রফিক) আত্নত্যাগ করেন। ১৯৬৩ সালে অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান পুনরায় কো-এডুকেশন চালু করেন। ১৯৬৮ সালে এটি সরকারিকরণ করা হয়, কিন্তু পরের বছরেই আবার এটি বেসরকারি মর্যাদা লাভ করে। ১৯৬৮ সালে পাক সামরিক বাহিনী জগন্নাথ কলেজ কেন্দ্রিক স্বাধিকার আন্দোলনকে দমানোর জন্য জগন্নাথ কলেজকে সরকারিকরণ করে শুধুমাত্র বিজ্ঞান কলেজে রূপান্তরিত করে। এর বাণিজ্য ও মানবিক বিভাগকে সরিয়ে মহাখালীতে নতুন জিন্নাহ কলেজ খোলা হয় (বর্তমান তিতুমীর কলেজ)। ১৯৭২ সালে জগন্নাথে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু হয়। সে সময় দেশের অন্য অনেক কলেজের মতো এই কলেজও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজ ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে ১৯৯১-৯২ শিক্ষাবর্ষ থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শিক্ষা কার্যক্রম চলতে থাকে।

৫২'র ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা ও ১১ দফা আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় এ কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রশংসনীয় অবদান রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালে এ কলেজে পাকিস্তানি হানাদা বাহিনীর ক্যাম্প ছিলো। স্বাধীনতার পর ক্যাম্পাস থেকে একাধিক গণকবর আবিষ্কৃত হয়। শহীদদের স্মরণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য 'একাত্তরের গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি'।

২০০৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ৮ম জাতীয় সংসদের ১৮তম অধিবেশনে গৃহীত 'জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫' (২৮ নং আইন) বলে কলেজটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরিত হয়। ২৭/৪ ধারা বাতিলের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টু পূর্নাঙ্গতা পায়। পূর্বতন জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে যাত্রা শুরু করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা প্রথমবারের মতো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা সনদ গ্রহণ করেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ২০০৫-০৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার  সুযোগ পায়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম খান। বিশ্ববিদ্যালয়টি ১১.১১ একরের উপর প্রতিষ্ঠিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি অনুষদের অধীনে ৩৬ টি বিভাগ ও ২ টি ইন্সটিটিউটে প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখরিত হয় ক্যাম্পাস।

ঐতিহ্য ও গৌরবের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৫ সালে কলেজ হতে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বীকৃতি পায় দেশের অন্যতম প্রাচীন এ বিদ্যাপীঠ। বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সাফল্যের ১৫ বছর পূর্ণ করে ১৬ বছরে পদার্পণ করছে জবি। পাশাপাশি ১৬৩ বছরে পা দিচ্ছে ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ২০ অক্টোবরকে ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। গৌরব ও সাফল্যের ১৫ বছরে ক্যাম্পাসের অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রসারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এক অভূতপূর্ব ভূমিকা পালন করে আসছে।

সংগ্রহেঃ

মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ

শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাস সাংবাদিক

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

No comments

Powered by Blogger.