ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ১৬২ বছরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ১৬২ বছরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (সংক্ষেপে-জবি) বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কোতোয়ালি থানার সদরঘাট এলাকায় চিত্তরঞ্জন এভিনিউতে অবস্থিত একটি স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে জগন্নাথ রায় চৌধুরী একটি পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা "জগা বাবুর পাঠশালা" নামে পরিচিত ছিল। তৎকালীন ব্রাহ্ম আন্দোলনের নেতা দীননাথ সেন, অনাথবন্ধু মৌলিক, পার্বতী চরণ রায়, ব্রজসুন্দর মিত্র প্রমুখের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্রাহ্ম ধমের্র মূল মতবাদ সম্পর্কে সাধারণ ছাত্রদের শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় ব্রাহ্ম সমাজের নিজস্ব প্রাঙ্গণে জগা বাবুর পাঠশালাকে স্থানান্তর করে একটি অবৈতনিক স্কুল তৈরি করেছিলেন যার নাম দেয়া হয়েছিল "ব্রাহ্ম স্কুল"। প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে কিছুটা মতবিরোধ থাকলেও অনাথবন্ধু মৌলিক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যালেন্ডারের তথ্যমতে ১৮৫৮ সালকে সঠিক বলে ধরা হয়। আর্থিক সংকটের কারণে ১৮৭২ সালে মালিকানা পরিবর্তন করে ব্রাহ্ম স্কুলের ভার তুলে দেওয়া হয়েছিল জগন্নাথ রায় চৌধুরীর সুযোগ্য পুত্র বালিয়াটির জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরীর হাতে। তখন জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী ব্রাহ্ম স্কুলের নাম পরিবর্তন করে তার বাবা জগন্নাথ রায় চৌধুরীর নামে "জগন্নাথ স্কুল" নামকরণ করেন এবং স্কুলটিকে স্থানান্তর করেন বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে। এরপর থেকেই জগন্নাথ স্কুলের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। পরবর্তী সময়ে ১৮৮৪ সালে এটি দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজের মর্যাদা লাভ করে। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির "জগন্নাথ কলেজ" নামকরণ করা হয়। ১৮৮৭ সালে "কিশোরীলাল জুবিলি স্কুল" নামে স্কুল শাখাকে জগন্নাথ কলেজ থেকে পৃথক করা হয় যা বর্তমানে বাংলাবাজার এলাকায় অবস্থিত "কে. এল. জুবিলি স্কুল এন্ড কলেজ" নামে পরিচিত। জগন্নাথ কলেজ ১৯০৮ সালে প্রথম শ্রেণির কলেজের মর্যাদা লাভ করে।

১৯২০ সালে ইন্ডিয়ান লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের নেক নজর আসে প্রতিষ্ঠানটির ওপর। সে বছর "জগন্নাথ কলেজ আইন" পাস করে ব্রিটিশ ভারতীয় সরকার। কিন্তু পরের বছর ১৯২১ সালে "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়" প্রতিষ্ঠিত হলে জগন্নাথ কলেজের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কার্যক্রম বন্ধ করে ইন্টারমিডিয়েট কলেজে অবনমন করা হয় এবং "জগন্নাথ ইন্টারমিডিয়েট কলেজ" নামকরণ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার সাজাতে নিজেদের গ্রন্থাগারের ৫০ ভাগ মূল্যবান ও দুর্লভ বই দান করে জগন্নাথ কলেজ। নিউমার্কেট এলাকায় জগন্নাথ কলেজের নিজস্ব সম্পত্তির ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের "জগন্নাথ হল" নির্মাণ করা হয়। জগন্নাথ কলেজের স্নাতকের শিক্ষার্থী-শিক্ষক, বেঞ্চ-টেবিল ইত্যাদি নিয়ে শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক যাত্রা। সর্বোপরি জগন্নাথ কলেজের সমগ্রটাই নিয়ে তৈরি হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

১৯৪২ সালে জগন্নাথ কলেজে কো-এডুকেশন চালু হলেও ১৯৪৮ সালে পাক সরকারের নির্দেশে তা বন্ধ হয়ে যায়। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সুযোগ দিতে জগন্নাথ কলেজে তখন প্রথমবারের মত নৈশকালীন পাঠদান শুরু হয়। ১৯৪৯ সালে দীর্ঘ ২৮ বছর পর জগন্নাথ কলেজে আবারও স্নাতক কার্যক্রম চালু হয় এবং আবারও নাম পরিবর্তন করে "জগন্নাথ কলেজ" রাখা করা হয়। ১৯৬৩ সালে অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান জগন্নাথ কলেজে পুনরায় কো-এডুকেশন চালু করেন।

১৯৬৮ সালে পাক সামরিক বাহিনীর নেতা আব্দুল মোনায়েম খাঁন জগন্নাথ কলেজকেন্দ্রিক স্বাধিকার আন্দোলনকে রুখতে না পেরে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে এক পর্যায়ে জগন্নাথ কলেজকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়। ছয়মাস বন্ধ থাকার পর কলেজকে পুনরায় চালু করতে বাধ্য হয়। কিন্তু মোনায়েম খাঁন জগন্নাথ কলেজকেন্দ্রিক সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিজের গদি নরবরে দেখে তার কূটকৌশলের মাধ্যমে একে সরকারি কলেজে রুপান্তর করে দেয় এবং কলেজের সমগ্র ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নেয়। তখন একে সরকারিকরণ (প্রাদেশিকীকরন) করে শুধু বিজ্ঞান কলেজে রূপান্তর করে দেয়। এর বাণিজ্য ও মানবিক বিভাগকে সরিয়ে মহাখালীতে নতুন "জিন্নাহ কলেজ" খোলা হয় যা বর্তমানে "সরকারি তিতুমীর কলেজ" নামে পরিচিত। পরের বছর ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফায় জগন্নাথ কলেজকে সরকারীকরণের বিরোধিতা করলে ওই বছরই কলেজটি আবার পূর্বের ন্যায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ফিরে যায়। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জগন্নাথ কলেজে সকল বিভাগের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্স চালু হয়। সে সময় দেশের অন্যান্য কলেজের ন্যায় এই কলেজও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজ ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে ১৯৯১-৯২ শিক্ষাবর্ষ থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শিক্ষা কার্যক্রম চলতে থাকে। এ সময় প্রতিষ্ঠানের নাম "জগন্নাথ সরকারি কলেজ" ছিল।

এরপর জগন্নাথ কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে রাজপথে আন্দোলন করতে থাকে তৎকালীন শিক্ষার্থীরা। নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে অবশেষে ছাত্রদের দাবী মেনে নিতে বাধ্য হয় সরকার। ২০০৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ৮ম জাতীয় সংসদের ১৮ তম অধিবেশনে "জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন - ২০০৫" সংসদে উত্থাপিত হয় এবং ওই বছরেরই ২০ অক্টোবর একটি সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জগন্নাথ কলেজকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণা করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। অধ্যাপক ড. এ কে এম সিরাজুল ইসলাম খান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য।

কলেজ থাকাকালীন পুরান ঢাকার রাজনৈতিক ব্যাক্তিবর্গ এবং প্রভাবশালীদের দাপটে একে একে বেদখল হয়ে যায় সবগুলো আবাসিক হল। সম্পূর্ণ আবাসন বিহীন এবং সরু সংকীর্ণ ক্যাম্পাসের ঘানি মাথায় নিয়েই যাত্রা শুরু করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। যার ফলে শিক্ষার্থীদের মানবেতর জীবনযাপন করে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হচ্ছে সেই প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই। বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ৬টি অনুষদে ৩৬টি বিভাগ ও ২টি ইনস্টিটিউট রয়েছে। অক্টোবর ২০১৯ এর তথ্য অনুযায়ী স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এম ফিল ও পিএইচডি মিলে বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ১৭,১৩৪ জন শিক্ষার্থী, ৯৬০ জন একাডেমিক স্টাফ এবং ৮৫০ জন প্রশাসনিক স্টাফ রয়েছে।

নানা প্রতিকুলতার দরুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১৫ তম বছরে এসে ২০২০ সালের ১১ই জানুয়ারি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রসাশন আয়োজন করে ১ম সমাবর্তনের। ২০২০ সালের ২০ অক্টোবর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় করোনা ভাইরাস সংক্রমন পরিস্থিতিতেও স্বাস্থবিধি মেনে সীমিত পরিসরে উদযাপন করে ১৫ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। পদার্পণ করে ১৬ তম বর্ষে। বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সম্পূর্ণ হয় ১৫ বছর এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে সম্পূর্ণ হয় ১৬২ বছর। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনেই উদ্ভোধন হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম হল "বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল"।

শিক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিটি আন্দোলনে এই প্রতিষ্ঠানের অবদান ছিল গর্ব করার মত। রয়েছে ৫২'র ভাষা আন্দোলন, ৬২ তে সামরিক সরকারের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ৬৬ এর ছয়দফা দাবি, ৬৮ এর এগারো দফা দাবি, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।

ভাষা আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যোগ দিয়ে জগন্নাথের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখ করার মতো। ১৯৪৮ সালের ২৩'শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সংশোধনী প্রস্তাব বাতিল হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ কলেজ ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের মিছিলের মাধ্যমে ঢাকায় প্রথম প্রতিবাদ শুরু হয় ২৬'শে ফেব্রুয়ারি। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগেই দেশের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে। ভাষা আন্দোলনের সময় জগন্নাথ কলেজ ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে আলাদা করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে উঠেছিল। ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য ও যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত হয় প্রথম পুস্তিকা "রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন - কী ও কেন?" যার লেখক ছিলেন জগন্নাথ কলেজের তৎকালীন শিক্ষার্থী অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। ১৯৫২ সালের ২১'শে ফেব্রুয়ারিতে প্রথম যে ১০ জন ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল ও রাজপথে প্রতিবাদ শুরু করেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র প্রখ্যাত কথাশিল্পী ও চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হান। ১৯৫২ সালের মাতৃভাষা বাংলার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় এই আন্দোলনে সর্বপ্রথম শহীদ হন জগন্নাথ কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র রফিক উদ্দিন আহমদ। ৫২'র ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করায় কারাবরণ করেন জগন্নাথ ছাত্র সংসদ (জকসু) এর তৎকালীন জিএস শফিউদ্দিন আহমদক ও ভাষা আন্দোলনের একজন বলিষ্ঠ সংগঠক অজিত কুমার গুহ। জাতীয় অধ্যাপক ড. সালাহউদ্দীন আহমেদসহ অন্যান্য শিক্ষকরা এই প্রতিষ্ঠান থেকেই ছাত্রদের ভাষা আন্দোলনে উৎসাহিত করতেন। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেও ভাষা আন্দোলনে জগন্নাথের অবদানের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস পাওয়ায় যায়।

১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনে মূলত "জগন্নাথ কলেজ" ও "ঢাকা কলেজ" ক্যাম্পাস থেকেই প্রতিবাদের সূচনা করা হয়। শিক্ষা আন্দোলনের নেতা হায়দার আকবর খাঁন বলেন, "যতদূর মনে পড়ে জগন্নাথ কলেজ ও ঢাকা কলেজের কয়েকজন ছাত্র প্রথমে ছাত্র সমস্যার দিকে দৃষ্টিপাত করে কলেজ থেকেই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়। পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতারা এই আন্দোলনটিকে আরও বেগবান করে।"

তৎকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত ছয় দফা আন্দোলনেও জগন্নাথের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষিত হলে তার সমর্থনে সফল হরতাল পালন করে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মুজিব বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান কাজী আরেফ আহমেদ ও চিত্র নায়ক ফারুক।

১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হলে জগন্নাথ ছাত্র সংসদের (জকসু) উদ্যোগেই প্রথম প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জগন্নাথ কলেজে পাকিস্তানি হানাদাররা একের পর এক হামলা চালায়। মুক্তিযুদ্ধে জগন্নাথের বহু ছাত্র ও শিক্ষক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে এই প্রতিষ্ঠানের অগণিত ছাত্র পাক হানাদারদের নৃশংসতায় শহীদ হন। স্বাধীনতাকামী বাঙালির ওপর সংঘটিত অবর্ণনীয় নির্যাতন এবং গণহত্যার চিত্র তুলে ধরে শহীদদের স্মরণে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ২০০৮ সালের ৩১ মার্চ নির্মাণ করা হয় "মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি ও একাত্তরের গণহত্যা" নামক ভাস্কর্য। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এটি দেশের একমাত্র গুচ্ছ ভাস্কর্য।

ক্রীড়াক্ষেত্রেও একসময় খ্যাতি ছিলো এই বিদ্যাপীঠের। এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আন্তঃকলেজ ও আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয়ে ধারাবাহিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। এছাড়াও এখানকার শিক্ষার্থীরা জয় করেছিল রোনাল্ডস শিল্ড, স্যার এ এফ রহমান শিল্ড, ফিরোজ নুন কাপ প্রভৃতি। এই প্রতিষ্ঠানেরই শিক্ষার্থী ব্রজেন দাস ছয় বার ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে গড়েছেন সাতারের বিশ্ব রেকর্ড। ২০১৯ সালে সাউথ এশিয়ান গেমস এ বাংলাদেশের হয়ে প্রথম স্বর্ণপদক জয়ী মারজান আকতার প্রিয়া এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানেরই শিক্ষার্থী।

দেড় শতকের বেশি সময় ধরে মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করায় চারদিকে বহু সুনাম রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটির। একদা জগন্নাথ কলেজকে সম্পূর্ণ পঙ্গু বানিয়ে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়। সেই পঙ্গুত্ব নিয়ে একে একে এগিয়ে চলা প্রতিষ্ঠানটি যখন আবার স্বাভাবিক হয়েছিল, তখন আবারও পঙ্গু বানিয়ে ষড়যন্ত্রমুলকভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিল সরকারি তিতুমীর কলেজ (বর্তমান)। ভাষা আন্দোলনে, ছাত্র অধিকার আন্দোলনে, ছয় দফা আন্দোলনে যখন তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছিল জগন্নাথ, তখন তিলে তিলে শেষ করে দেয়া হয়েছিল এই প্রতিষ্ঠানটিকে এমনকি নিঃশেষ করে দেয়ার পায়তারা করেছিল। অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করার পরেও কয়েক বছর যাবৎ সরকারি অর্থ না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের বেতনভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়েছিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। ১১টি হল থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ব্যাক্তিবর্গ ও প্রভাবশালীদের দাপটে একে একে বেদখল হয়ে যায় পুরান ঢাকায় অবস্থিত সবগুলো হল। এভাবেই এ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও অনিয়ম কখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দেয়নি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হয়েও প্রাতিষ্ঠানিক আবাসন বিহীন জীবন মেনে নিয়ে আবারও তুমুল হারে এগিয়ে যাচ্ছে এখানকার শিক্ষার্থীরা। একমাত্র জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ই পেরেছে প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই দেশের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হতে। বিসিএস সহ দেশের বড় বড় জায়গায় এখানকার শিক্ষার্থীদের রাজত্ব চোখে পড়ার মত। মানসম্মত শিক্ষা প্রদানে এর খ্যাতি সমগ্র বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে এবং সংশ্লিষ্ট সকলের প্রচেষ্টায় ঢাকার কেরানীগঞ্জে নির্মিত হচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস। এটি হবে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে উন্নত, আধুনিক এবং দৃষ্টিনন্দন বিশ্ববিদ্যালয় যা দেখতে পর্যটক আসবে ভ্রমন করতে। আশাকরি সকল দিক মিলিয়ে ভবিষ্যতে এর শিক্ষার মান আরও উন্নত হবে এবং অধিষ্ঠিত হবে আরও উচ্চ আসনে সেই প্রত্যাশাই সবার।

লেখক:
কামারুজ্জামান শানিল
পরিসংখ্যান বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

No comments

Powered by Blogger.