নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকটে থাইল্যান্ড

নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকটে থাইল্যান্ড

থাইল্যান্ড দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার  জান্তা সরকার এর অধীনে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত একটি দেশ। ১৯৩২ সাল থেকে দেশটিতে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের কাছে থাইল্যান্ড হলো সামরিক শাসকদের দেশ। কেউ কেউ একে সংবিধান তৈরির দেশও বলে। সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের আমলে ১৯৩২ থেকে সেখানে এ পর্যন্ত ১৩ টি অভ্যুত্থান হয়েছে। এই হিসাব ব্যর্থ ৯ টা অভ্যুত্থান অতিরিক্ত। ২০২০ সালে সেখানে আরেক দফা অভ্যুত্থানের পদধ্বনি চলছে।

প্রতি দফা সামরিক শাসনের ইতিহাসের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে নতুন নতুন সংবিধান তৈরির ইতিহাস। গত ৯ দশকে দেশটিতে গড়ে প্রতি চার বছরে একটা সংবিধান লেখা হয়েছে। সর্বশেষটি হলো তিন বছর আগে। ২০১৪ সালে রাজা মাহা ভাজিরালংকর্ন ক্ষমতায় আরোহন করার পর দেশটির বিতর্কিত মানহানিকর আইনে পরিবর্তন আনেন। এই আইনে থাই রাজপরিবার কিংবা রাজার সমালোচকদের শাস্তি হিসেবে  ড্রাকনিয়ান ১১২ ধারায় যেকোনো থাই নাগরিককে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়ার বিধান রাখা হয়।

তাঁর বাবা ভূমিবল আবুলওয়াদেজ প্রায় ৭০ বছর রাজা ছিলেন। বিশ্বের অন্যতম ধনী রাজপরিবার এটা। তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সম্পদ বাড়ছে তুমুল গতিতে। ব্যাংক থেকে সিমেন্ট ফ্যাক্টরি পর্যন্ত সবই আছে তাঁদের। ক্রাউন প্রোপার্টি ব্যুরো (সিপিবি) নামের একটা সংস্থাই আছে এই সম্পদের ব্যবস্থাপনায়। এসব সম্পদ রাজার ব্যক্তিগত হলেও তাঁর পরিবারের ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিতদের বেতন–ভাতা জনতার কর থেকেই দিতে হয়। বছরে ১৫ থেকে ২০ কোটি ডলার ব্যয় হয় রাজপরিবারের জন্য নিয়োজিত কর্মীদের পেছনে।

যেহেতু রাজপরিবার নিয়ে প্রশ্ন তোলা বেআইনি, তাই সিপিবির কাজ-কারবারও থাকছে স্বচ্ছতা-জবাবদিহির ঊর্ধ্বে। খুবই রক্ষণশীল হিসেবে ভাজিরালংকর্ণের রয়েছে ৪০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদ। সচরাচর এই রাজা জার্মানিতে একটা বিশেষ হোটেলে থাকেন বছরের দীর্ঘ সময়। সেখানে থাকাকালে দেশে কাউকে যাতে তাঁর ক্ষমতার অস্থায়ী দায়িত্ব দিয়ে ‘রিজেন্ট’ নিয়োগ দিতে না হয়, সেটাও তিনি সংবিধানে লিখিয়ে নিয়েছেন ২০১৭ সালে। এভাবেই থাইল্যান্ড দেশটি বছরের কিছু সময় জার্মানি থেকে শাসিত হচ্ছে। সর্বশেষ করোনাকালীন সময় তিনি সপরিবারে জার্মানিতে আইসোলেশনের জন্য পাড়ি জমান। এখনো পর্যন্ত যে সকল রাষ্ট্রপ্রধান রাজপরিবারের আনুগত্য স্বীকার করতে অস্বীকৃতি প্রদান করেছিল তাদের কপালে অনেক খারাপ কিছু জুটেছে, রাজপরিবার তাদেরকে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত করেছিল।

আর এভাবেই ২০০৬-এ সরানো হয়েছিল থাকসিন সিনাওয়াত্রার সরকারকে। ২০১৪ সালে সরানো হয় ইংলাক সিনাওয়াত্রাকে। এই দুজনের ক্ষমতার ভিত্তি দেশটির দরিদ্র জনতার সমর্থন। থাকসিনের আমলেই থাইল্যান্ডে কোনো নির্বাচিত বেসামরিক সরকার প্রথমবারের মতো মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছিল। কিন্তু রাজপরিবারকে ঘিরে থাকা অভিজাততন্ত্রকে সন্তুষ্ট রাখতে পারেননি থাকসিন ও ইংলাক। ফলে যেতে হয় তাঁদের।

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের এভাবে নাজেহালের শুরু দেশটির ইতিহাসের প্রথম স্বচ্ছ নির্বাচন থেকেই। ১৯৭৩ ও ১৯৭৬ সালের দুটো নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়েও জনপ্রিয় লোক নেতা সেন প্রামোজকে রাজনীতি থেকেই বিদায় নিতে হয়। অথচ জন্মগতভাবে রাজপরিবারেরই সদস্য ছিলেন তিনি। জনতার সার্বভৌমত্ব রাজপরিবারের সার্বভৌমত্বের ওপর ছায়া বিস্তার করলেই দেশটিতে সামরিক শাসনের গুঞ্জন শুরু হয়। এই প্রক্রিয়াতেই সর্বশেষ ২০১৪ সালে ক্ষমতা নেন জেনারেল প্রাউত চান-ওচা। বিতর্কিত এক প্রক্রিয়ায় এই ‘জেনারেল’ এখন ‘প্রধানমন্ত্রী’ হয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমাতে চাইছেন জরুরি অবস্থা জারি করে।

কিন্তু এই নতুন আন্দোলন শুরু হয়েছে গত ফেব্রুয়ারি মাসে, যখন সে দেশের আদালত একটি নবগঠিত গণতন্ত্রপন্থী রাজনৈতিক দলকে বিলুপ্ত করার রায় দেয়। ফিউচার ফরোয়ার্ড পার্টি (এফএফপি) থাই তরুণ এবং প্রথমবারের ভোট দাতাদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় ছিল। গত বছর মার্চ মাসের নির্বাচনে দলটি সংসদের তৃতীয় বৃহত্তম দলে পরিণত হয়েছিল। ঐ নির্বাচনেই সামরিক অধিনায়করা নির্বাচিত হন।

মাঝে করোনাকালীন সময়ে বিক্ষোভ সমাবেশ কিছুদিন বন্ধ ছিল। কিন্তু এই করোনাকালীন সময় থাইল্যান্ডে সরকার নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। তাছাড়া সেটার সাথে যোগ হয়েছে গত জুন মাসে একজন জনপ্রিয় গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকারী ওয়ানচালরাম সাকসাতসিত প্রতিবেশী দেশ ক্যাম্বোডিয়া থেকে গুম হওয়ার পর বিক্ষোভ আবারও দানা বাঁধতে শুরু করে। থাইল্যান্ডে অভ্যুত্থানের পর থেকে মি. ওয়ানচালরাম সেখানে নির্বাসিত জীবন যাপন করছিলেন। তিনি এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন যে তার অপহরণের পেছনে থাই রাষ্ট্রযন্ত্রের হাত রয়েছে। কিন্তু সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এরপর জুলাই মাস থেকেই থাইল্যান্ডে রাজতন্ত্র ও রাজনৈতিক পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ চলে আসছে।

ছাত্রনেতৃত্বাধীন বিভিন্ন গ্রুপের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুত চ্যান-ওচার বিরুদ্ধে গত এক মাস ধরেই বিক্ষোভ চলছে। সাবেক এ সেনাপ্রধান ২০১৪ সালে এক সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন এবং প্রো-এস্টাবলিশমেন্ট সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গত বছরের বিতর্কিত নির্বাচনে ক্ষমতায় বসার পর থেকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে কোণঠাসা করে রাখছে প্রায়ুত চ্যান-ওচার সরকার।

নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকটে থাইল্যান্ডের রাজপরিবার ও সরকার

সর্বপ্রথম বিক্ষোভকারীদের  টার্গেট প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুত চ্যান-ওচার দিকে থাকলেও পরবর্তীতে সেটি গোটা রাজপরিবারের বিরুদ্ধে এবং রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে রূপ নেয়। সরকার সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানোর দাবি তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। একই সঙ্গে ২০১৭ সালে সেনা-সমর্থিত মদদে তৈরি সংবিধানের আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানাচ্ছেন তারা। ওই সংবিধানের ফলেই প্রায়ুত ওচা সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছে আন্দোলনকারীরা।

গত কয়েকদিন যাবত ব্যাংককের রাজপথে লাখো লাখো মানুষ বিক্ষোভ করছেন। তাদের প্রথম দাবি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জেনারেল  প্রায়ুত চ্যান-ওচার সরকারের পদত্যাগ, বিদ্যমান সংবিধান বাতিল করে নতুন সংবিধান প্রণয়ন এবং থাই রাজপরিবারের আইনি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্তৃত্বের সংস্কার দাবি করেছেন। ছাত্র-ছাত্রীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের কঠোর সমালোচনা করা বক্তব্য ,  মিম কিংবা ব্যঙ্গচিত্র পোস্ট করে বিক্ষোভকে চাঙ্গা করে তুলছে ।

গত আগস্টে বিক্ষোভরত জনতার সামনে পানুসায়া সিথিজিরাওয়াতানাকুল নামের ২১ বছর বয়সী এক তরুণ ১০ দফা দাবি সংবলিত একটি ঘোষণাপত্র পাঠ করার পর বিক্ষোভ নতুন দিকে মোড় নেয়।পানুসায়ার ভাষণ বিক্ষোভে একটি ঐতিহাসিক মাত্রা যোগ করে এবং এরপরই বিক্ষোভ দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

পানুসায়া তার ঘোষণাপত্রে যে সকল দাবিগুলো উত্থাপন করেছেন সেগুলো থাইল্যান্ডের ইতিহাসে বিরল। কারণ ইতিপূর্বে রাজপরিবারকে সমালোচনা করে এমন ধরনের দাবি উত্থাপন এর ঘটনা দেখা যায়নি। তাঁর দাবিগুলোর অন্যতম হলো রাজাকে যে আইনের মাধ্যমে সব ধরনের অপরাধ থেকে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে তা তুলে নিতে হবে, রাজার অসম্মান প্রতিরোধ করার আইন (যে আইনের মাধ্যমে রাজপরিবারের বিষয়ে যে কেউ সমালোচনা করলে তাকে জেল জরিমানা করা হয়) বাতিল করতে হবে, রাজপরিবারের ব্যয় নির্বাহে সরকারি বরাদ্দ কমাতে হবে, রাজ পরিবারের সদস্যদের রাজনৈতিক মন্তব্য করা থেকে বিরত রাখতে আইন করতে হবে, রাজপরিবারের সদস্যদের সমালোচনা করার জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যত লোক গুমের শিকার হয়েছে তাদের সবার অন্তর্ধান এর বিষয় নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে ইত্যাদি।

ছাত্রনেতা পানুসায়ার দাবিগুলো যে শুধুমাত্র শিক্ষিত তরুণদের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে এটি নয় বরং এটি শ্রমিক শ্রেণীর ,দরিদ্র থেকে মধ্যবিত্ত সবার অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করবে। সকল শ্রেণীর মানুষ এই দাবির ভিতরে যেন তাদের নিজেদের স্বার্থ খুঁজে পেয়েছেন। পানুসায়ার দাবি যেন তাদের নিজেদের দাবি এজন্য  লাখ লাখ লোক বিক্ষোভ করার জন্য রাস্তায় নেমে এসেছে । ১৪ অক্টোবর কয়েক লক্ষ লোক রাস্তায় নেমে প্রাউত ওচার  সরকারি বাসভবন ঘেরাও করে এবং তার সরকারের পদত্যাগ দাবি করেন।

এদিকে জেনারেল প্রাউত বিক্ষোভকারীদের কোন দাবি না মেনে নেয়ার পক্ষে অটল রয়েছে। এই কারণে তিনি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন কিন্তু সর্বশেষ বিক্ষোভকারীদের চাপের মুখে সেটি উঠিয়ে নিতে বাধ্য হন। তাছাড়া তাঁর সরকার ছাত্রনেতা পানুসায়াকে গ্রেপ্তার করেছিল কিন্তু একদিনের মধ্যে তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।

রাজধানী ব্যাংককের গ্রান্ড প্যালেসের কাছে ‘পিপলস ফলক’ নামে একটি ফলক স্থাপন করেছে তারা। এ সময় সেখানে ঘোষণা দেয়া হয়, ‘থাইল্যান্ডের মালিক জনগণ’। ২০ সেপ্টেম্বর  সকালে স্থাপন করা ফলকটিতে থাই ভাষায় লেখা হয়, ‘জনগণ এই মনোভাব প্রকাশ করছে, এই দেশের মালিক জনগণ; রাজা নয়। ’স্বৈরতন্ত্রের শেষ টানো’ এবং ‘বিক্ষোভের জন্য বন্ধুদের ট্যাগ করুন’ এমন হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে বিক্ষোভের আহ্বান জানানো হচ্ছে। ২০ সেপ্টেম্বর থাইল্যান্ডে টুইটারে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল এ হ্যাশট্যাগটি।

এদিকে রাজতন্ত্রের পক্ষের একটি দল থাইল্যান্ডের রাস্তায় বিক্ষোভ করেছে তাদের দাবি বিক্ষোভকারীরা জেনারেল প্রাউতের দিকে  আঙুল উঠাতে পারে কিন্তু তারা কোনভাবেই থাইল্যান্ডের রাজার দিকে আঙুল উঠাতে পারবে না। এই দাবি নিয়ে তারা বিক্ষোভ সমাবেশ করছে।

সর্বশেষ ২২ অক্টোবর বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের জন্য ৩ দিনের সময় বেঁধে দেয় কিন্তু সে সময় ভিতর  জেনারেল প্রাউড পদত্যাগ না করায় ২৫ অক্টোবর গণতন্ত্র পন্থীরা আবারো রাস্তায় নেমে আসে। এখনো পর্যন্ত বিক্ষোভ চলছে।

থাইল্যান্ডের পূর্বের ইতিহাস এর মতো এই বিক্ষোভ একটি নতুন বিপ্লবের দিকে মোড় নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ ইতোপূর্বে কোন বিক্ষোভ-সমাবেশ রাজপরিবারকে আক্রমণ করার মাধ্যমে সন্নিবেশিত হয়েছে এমন নজির বিরল। তাছাড়াও বর্তমান বিক্ষোভকারীদের মধ্যে অধিকাংশ তরুণ এবং শিক্ষার্থী তারা চায় বাকস্বাধীনতা, তারা চায় থাইল্যান্ডের প্রকৃত গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে । সুতরাং এই আন্দোলনের মাধ্যমে যে কোন ধরনের পরিবর্তন আসলে থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন সাধিত হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

লেখক:

মুছা কালিমুল্লা

শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

No comments

Powered by Blogger.