চাই ধর্ষক ও ধর্ষণবিহীন একটি সুন্দর বাংলাদেশ!


চাই ধর্ষক ও ধর্ষণবিহীন একটি সুন্দর বাংলাদেশ!
পৃথিবীতে সাধারণত মানুষকে আমরা দুভাগে ভাগ করি। চরিত্রের ভিত্তিতে দুইধরনের, ভালো মানুষ আর খারাপ মানুষ। বুদ্ধিমত্তার দিক দিয়েও মানুষ দুইধরনের, চালাক মানুষ আর বোকা মানুষ। আবার হুমায়ুন আহমেদ স্যারও মানুষকে দুভাগে ভাগ করেছেন, হ্যাঁ মানুষ আর না মানুষ। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে মানুষের যে আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য থাকা একান্ত প্রয়োজন আধুনিক সমাজে এসে তা দিনকে দিন লোপ পাচ্ছে। ধর্ষণ সমাজ ও দেশের ক্যান্সার স্বরূপ, পচে যাওয়া দগদগে ঘা। দিনে দিনে বেড়েই চলছে ধর্ষণের ভয়াবহতা।ধর্ষণ রূপ নিয়েছে এক ভয়ংকর মহামারীতে। বেশ কিছুদিন ধরেই ধর্ষণ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। বিষয়টা একদিক থেকে ইতিবাচক। কেউ বলছেন পুরুষ মাত্রই ধর্ষক আবার কেউ একটু সংশোধন করে বলছেন সকল পুরুষ মস্তিষ্কে ধর্ষক। অনেকেই আবার বলছেন সকল পুরুষ ধর্ষক নয়।সকল পুরুষদের ধর্ষক বলে যদি ধর্ষণের মাত্রা কমানো যেতো বা ধর্ষণ প্রতিরোধ করা যেতো তবে লক্ষ কোটি বার সকল পুরুষকে ধর্ষক বলার পক্ষপাতী। পুরুষকে ধর্ষক বলায় পুরুষেরা লজ্জিত হতে পারে কিন্তু ধর্ষণ কি থেমে যাবে?

প্রতি ১৫ মিনিটে একটি বিশাল দেশে একজন ধর্ষণের স্বীকার হয়। পলি-বিধৌত নরম বাংলার বুকে, মৌসুমি জলবায়ুর আকাশে আজ মনুষ্যত্বহীন পাশবিক যৌনলিস্পা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৯ সালে ধর্ষণ  ঘটেছে ৫৪০০ টি। এটি শুধুমাত্র পুলিশ পরিসংখ্যান। এর বাহিরেও কত ঘটনা যে আড়ালে আছে তা কে জানে! যাহোক, ৫৪০০ টি ধর্ষণ হিসেব করলে প্রতি এক লক্ষে প্রায় চার জন নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এটি শুধুমাত্র দাপ্তরিক হিসেব। বাস্তবতা কতটা ভয়াবহ তা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন।

আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী একজন নারী। প্রধানমন্ত্রী নারী হওয়া সত্বেও এদেশে ধর্ষণ হয় তার কোন কঠিনতর বিচার হয়না! এটা খুবই লজ্জাজনক এবং হতাশাজনক। এই পচন অবশ্যই অবশ্যই থামাতে হবে। এই সামাজিক ব্যাধিকে সমাজ ও প্রশাসন উভয়ই হস্তে দমাতে হবে।  ইসলাম শুরু থেকে এই ঘৃণ্য অপরাধকে অবদমন করেছে। ধর্ষণের মতো এহেন ঘৃণ্য কাজকে ইসলাম সমাজ থেকে নিশ্চিহ্ন করার নির্দেশ দিয়েছে এবং ধর্ষণের ব্যাপারে যথেষ্ট কঠোরতা অবলম্বন করার কথা ইসলামে বলা হয়েছে। ইহকাল ও পরকালে দিয়েছে ভয়ংকর শাস্তির স্পষ্ট ঘোষণা। শুধু ইসলাম ধর্মেই নয় সকল ধর্মেই ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য কাজের ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।

ধর্ষকের কোন দল নেই। ধর্ষকের কোন পরিচয় নেই। ধর্ষক দেশ ও জাতির শত্রু। ধর্ষণের এই মহামারী কে প্রতিরোধ করতে, জনসচেতনতা তৈরি করতে,"আসুন এক হই, যুক্ত হই বিপ্লবে! মানবতার উত্তানে! নারীর প্রতি লুলুপ দৃষ্টিতে তাকানো শকুনদের এখনই থামাতে না পারলে রাষ্ট্রকে চরম মূল্য দিতে হবে ইতিহাসের কাঠগড়ায়।"

কঠিন সত্যটা হচ্ছে ধর্ষণ প্রতিরোধের কার্যকরী ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত আমাদের দেশ তো দুরের কথা উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই নেয়া হয় নাই। তবে কঠিনতর শাস্তির ব্যবস্তা রাখা হয়েছে। যা আমাদের দেশে থাকলেও এর কার্যকারীতা খুবই অল্প। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এই বিষয়টা বরাবরই উপেক্ষিত। তবে কিছু কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আমরা ধর্ষণ প্রতিরোধে সক্ষম হতে পারি। যেমনঃ

১.নীরব দর্শক হয়ে থাকা চলবে না। আমাদের আশেপাশে প্রতিনিয়ত মেয়েদের সাথে নানা ধরণের অনৈতিক কার্যকলাপ চলছে। যারা পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যাতায়াত করেন তারা এগুলোর সম্মুখীন বেশি হন। এমন কিছু দেখলে সাথে সাথে প্রতিবাদ করতে হবে। একা ভয় পেলে পাশের জনকে বলতে হবে। প্রতিবাদের ভাষা কঠিন হতে হবে। যারা অপরাধী তারা ভীতু প্রকৃতির হয়।

২. ধর্ষণ বিরোধী প্রচারণা। ধর্ষণের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। এতে করে মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে পরিবর্তন সম্ভব। “Don’t be that guy” –নামক প্রচারণার ফলে ভ্যানকুভারে যৌন সহিংসতা প্রায় ১০ ভাগ কমে গিয়েছে। যুক্তরাজ্যে আরো অনেক প্রচারণা আছে যা ধর্ষণ প্রতিরোধে সহায়তা করছে। নারীবাদী সংগঠন TBTN বা Take Back The Night এবং V-Day এই বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে।

৩.ভাষাগত দিক থেকে সাবধানতা অবলম্বন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মনে রাখতে হবে ধর্ষণ ‘যৌন মিলন নয়’, ‘অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন সম্পর্ক নয়’ কিংবা ‘যৌনতার অপব্যবহার নয়’। বৈধ ধর্ষণ বলে কিছু নাই। প্রেমিকের দ্বারা ধর্ষণ, স্বামী কর্তৃক ধর্ষণ অথবা সংগী কর্তৃক ধর্ষণ এগুলী সবই ধর্ষণ। ধর্ষণ, ধর্ষণই। এটা গুরুতর অপরাধ।

৪. মিডিয়া এবং যোগাযোগ মাধ্যম কর্তৃক ব্যবস্থা গ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। টেলিভিশন, রেডিও এবং সংবাদপত্রে ধর্ষণবিরোধী প্রচারণা প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু এর ভূমিকা অপরিসীম। নাটক, সিনেমাসহ বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠানে ধর্ষণদৃশ্য বর্জনীয়। বিভিন্ন বিজ্ঞাপণে নারীদের পণ্য হিসেবে ব্যবহারের যে রেওয়াজ চালু রয়েছে সেগুলো শুধু নারী অবমাননাই নয় নারীদেরকে বস্তু ভাবতে সহায়ক। প্রযোজক এবং পরিচালকেরা এখানে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারেন। বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যম ও মোবাইলফোনে ম্যাসেজের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো যেতে পারে।

রাষ্ট্র কর্তৃক দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে আইন থাকলেও প্রয়োগ নাই। যথাযথ সেল গঠনের মাধ্যমে খুব দ্রুত বিচার কার্য সম্পন্ন করা হলে এই ঘৃণ্যতম অপরাধ দমনে সফলতা আসবেই।

এরকম আরো উপায় থাকতে পারে যার মাধ্যমে ধর্ষণ প্রতিরোধ সম্ভব। আলোচিত উপায়গুলো বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে প্রাপ্ত এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে তুলে ধরা হয়েছে। পুরুষ মাত্রই ধর্ষক অথবা সকল পুরুষকে সম্ভাব্য ধর্ষকের কাতারে ফেলে দিয়ে ধর্ষণকে পুরুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টা রুখে দিতে হবে। আমাদের সাবধানতা এবং সচেতনতাই পারে ধর্ষণ প্রতিরোধ করতে।

"নির্লজ্জ জাতি এসো,  
এক হই এহেন নৃশংসতার  প্রতিবাদ করি।
নির্বাক জাতি এসো, 
এক হই এহেন হিংস্রতার প্রতিবাদ করি।
গড়ে তুলি ধর্ষক ও ধর্ষণ বিহীন দেশ, 
সোনার বাংলাদেশ।"

লেখক:
হোসাইন মোহাম্মদ ফয়সাল
হোসাইন মোহাম্মদ ফয়সাল
শিক্ষার্থী,অনার্স ১ম বর্ষ
চট্টগ্রাম কলেজ,চট্টগ্রাম।
hmfaisal8810@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.