কেনো বাড়ছে ধর্ষণ নামক অমানবিকতা?


কেনো বাড়ছে ধর্ষণ নামক অমানবিকতা?
বর্তমান সমাজের আরেকটি মহামারীর নাম ধর্ষণ। টিভি চ্যানেল কিংবা পত্রপত্রিকা সবখানে ধর্ষণের খবর একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪টি করে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। বিগত বছরগুলোর পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়- দেশে ২০১৮ সালে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৭৩২ টি। যার মধ্যে হত্যার ঘটনা ৬৩ টি। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায় ১৪১৩ তে আর হত্যার ঘটনা ৭৬ টি। চলতি বছরের এই ৯ মাসে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৯'শ টি ধর্ষণ এবং হত্যার ঘটনা ঘটে ৪১ টি। যার মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসেই সংগঠিত হয় ৬০ এর অধিক (সূত্র: আইন ও সালিশ কেন্দ্র)। আর এইসব পরিসংখ্যান প্রকাশিত ঘটনার আলোকে তৈরি করা। অজানা, অপ্রকাশিত আরো কত ধর্ষণ সংঘটিত হচ্ছে তার হিসেব কারো কাছে নেই। উল্লেখিত এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে দেশ এখন নৈতিক অবক্ষয়ের শেষ প্রান্তে গিয়ে পৌঁছেছে। চলুন ধর্ষণের এই তীব্র মাত্রার পেছনের কারণগুলো জানা যাক।

পারিবারিক শিক্ষার অভাব

পরিবারকে বলা হয় শিক্ষার আদি কেন্দ্র। আর এই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত কিংবা দূরে থাকা একটা সন্তান কতটা বেপরোয়া হতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সত্য কথা হচ্ছে সেই পরিবেশ থাকবেই বা কি করে, যেখানে প্রতিটা ঘরই যেন ভিনদেশী টিভি সিরিয়ালের একেকটা ভিসিআরখানা। আবার আমাদের সমাজে একটা মেয়ে বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে পরিবার যতটাই না কঠোর, ঠিক ততটাই নমনীয় একটা ছেলের ক্ষেত্রে। আমরা সন্তানের বড় হওয়া, ভাল কলেজে পড়া, ভাল রেজাল্ট করা, ভাল চাকরি পাওয়া এইসব বিষয়ে খুব ভাল তদারকি কিংবা নজর রাখি, কিন্তু আমার সন্তানটা কার সাথে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, তার চরিত্রটা কাদের সংস্পর্শে বেড়ে উঠছে তা অনেকটা ভুলেই বসে থাকি। যার ফলশ্রুতিতে তারা বেড়ে উঠছে পারিবারিক শিক্ষার অভাব এবং অসৎ সঙ্গ নিয়ে। যা পরবর্তীতে ধর্ষণের মত জঘন্য কাজে তাদের ধাবিত করে।

নীতি ও আদর্শের অবমূল্যায়ন এবং দুশ্চরিত্রের পালন

সমাজে আমরা দেখি নীতি ও আদর্শিক মানুষের কোনো মূল্যায়ন হয় না বললেই চলে। আজকাল সমাজে যার প্রতিপত্তি ও কাড়ি কাড়ি টাকা-পয়সা আছে, সে যতই অসৎ কিংবা দুশ্চরিত্রের হোক না কেনো সমাজের লোকজন তাকেই বেশি সম্মান করে। নীতি ও আদর্শে দণ্ডায়মান মানুষদের অবমূল্যায়ন করে দূরে সরিয়ে রাখে। অযোগ্যদের ক্ষমতায় বসিয়ে, সমাজে ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করছে। আর নীতি ও আদর্শকে খুব সহজে টাকার কাছে বিকিয়ে দিচ্ছে। যার ফলে সমাজে বাড়ছে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়।

নারী নিরাপত্তার অভাব

দেশে এখনো পর্যন্ত নারীদের শক্ত নিরাপত্তা গড়ে উঠেনি।স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কলকারখানা, অফিস-আদালত, যানবাহন সবখানে নারীদের আলাদা কোন পরিবেশ নেই। পুরুষের মত সব কাজে তাদেরকে অবাধে মেলামেশা করতে হয়। যার ফলে একজন নারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকে শুরু করে ধর্ষণের মত গর্হিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

নারী দেহের অশ্লীল প্রদর্শনী

ধর্ষণ বেড়ে যাবার পেছনে এটি একটি অন্যতম বড় কারণ। দেশের নাটক, সিনেমা, ওয়েব সিরিজ, পত্র-পত্রিকা, অনলাইন মিডিয়া সবখানে নারী দেহকে যৌন সুড়সুড়িমূলক চিত্রে প্রদর্শন করা হচ্ছে। এমনকি বর্তমানে বিজ্ঞাপন কিংবা ব্যবসায়িক প্রচারণার অন্যতম বস্তুই নারী। যার ফলে সমাজে যৌনতার একরকম অবাধ চর্চা চালু হয়ে গেছে। ফলাফল হিসেবে কিছু বিকৃত চিন্তার মানুষের কাছে ধর্ষিত হচ্ছে আমার দেশের মা-বোন।

আইনের যথাযত প্রয়োগ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব

ধর্ষণের মত মারাত্মক অপরাধ জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাবার পেছনে এটি আরেকটি অন্যতম কারণ। কেননা, বাংলাদেশ ধর্ষণ আইন ২০০০, ৯(১) ধারায় উল্লেখ আছে- "যদি কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন৷" ৯(২) ও (৩) এ ধর্ষকের সর্বোচ্চ মৃত্যদণ্ডের উল্লেখ আছে। ৯(৩) বলা হয়েছে, "যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন এবং ধর্ষণের ফলে উক্ত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা তিনি আহত হন, তাহা হইলে ঐ দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যুন এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন৷" অথচ এই আইনের দৃষ্টান্তমূলক ও কার্যকরী কোন শাস্তিই প্রয়োগ হয় না বললেই চলে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, দেশে প্রায় ৯৭ ভাগ ধর্ষকের শাস্তি হয় না। আবার অনেকে আছেন ক্ষমতাবানদের মদদপুষ্ট। যার ফলে অপরাধীরা বারবার ক্ষতমার জোরে পার পেয়ে বারংবার একেইরকম অন্যায় সংঘটিত করে। এতে তারা ভয়হীন বেপরোয়া হয়ে উঠে। ফলে ধর্ষণের মত গর্হিত কাজে তাদের আর কোন রকম অপরাধবোধ কাজ করে না।

বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্কের ছড়াছড়ি এবং বিয়েকে কঠিনে রূপান্তর

বর্তমান সমাজে অপ্রাপ্ত কিংবা প্রাপ্তবয়স্ক যেকোন ছেলেমেয়ের জন্য বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানোটা যতটা সহজ তার বহুগুণ কঠিন বিয়ের মত বৈধ সম্পর্কে জড়ানো। ফলে, একটা সময় গিয়ে যুবক-যুবতীরা অবৈধ শারীরিক সম্পর্কেও পর্যন্ত লিপ্ত হয়। এতে নৈতিকতার অবক্ষয় যেমন বাড়ছে, বাড়ছে ধর্ষণের মত জঘন্য অপরাধও।

পরিশেষে, সব কারণ বিচার বিশ্লেষণ করে এটা বলতে কোন দ্বিধা নেই যে, ধর্ষণ রুখতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সেটি যেমনটা সরকারকে, তেমনটা রাষ্ট্রের জনগণকেও। আইনের যথার্থ প্রয়োগ, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত, যৌন সুড়সুড়িমূলক যেকোন প্রদর্শনীকে নিষিদ্ধ, নারীর কর্মক্ষেত্রকে সুরক্ষিত, নৈতিক ও আদর্শের মূল্যায়ন এবং বিয়েকে সমাজে সহজ করার মাধ্যমে দেশে ধর্ষণের মাত্রাকে অনেকখানি কমিয়ে আনা যাবে বলে আশা করি। সেই সাথে সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের এই বিষয়ে সোচ্চার হতে হবে, ধর্ষককে কোন দলের বা গোষ্ঠীর চিন্তা না করে ধর্ষকের চোখে দেখতে হবে। ধর্ষকের পরিচয় কখনো কোন দলীয় হতে পারে না। কেননা, কোন দলই ধর্ষণের চর্চা করতে বলে না। বরং ধর্ষক দলীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে নিজের ইচ্ছাকে চরিতার্থ করার অপপ্রয়াস চালায়। আসুন একসাথে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই।

লেখক:
মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন
মোহাম্মদ নেজাম উদ্দীন
শিক্ষার্থী,ইংরেজি বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
nezamuddincu95@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.