নারী নির্যাতন রোধে চাই সামাজিক আন্দোলন

নারী নির্যাতন রোধে চাই সামাজিক আন্দোলন

নারীদের নিরাপত্তা বর্তমান সমাজে কোথাও নেই । এমনকি বর্তমানে দেখা যাচ্ছে নারীরা রাস্তাঘাটে যেমন নিরাপত্তাহীন, ঠিক তেমনি নারীরা বর্তমানে তাদের ঘরেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। কেননা যেখানে শ্বশুর দ্বারা পুত্রবধু ধর্ষিত, দুলাভাই দ্বারা শালিকা ধর্ষিত, আপন জন্মদাতা বাবা দ্বারা কন্যা ধর্ষিত, আপন ভাই দ্বারা বোন ধর্ষিত  এছাড়াও  এইরকম হাজারো  নারী নির্যাতনের  স্থিরচিত্র থেকে বুঝতে আর বাকি থাকছে না যে নারীরা ঘরের মধ্যে কতটুকু নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। নারী হিসেবে পৃথিবীতে জন্মগ্রহন করাটা কি পাপ?

আমাদের দেশে প্রতিদিন কত নারী যে ধর্ষণসহ বিভিন্ন  ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তার সঠিক হিসেব না থাকলেও এটা নিশ্চিত যে নারীর প্রতি নির্যাতন প্রতিনিয়ত ঘটেই চলেছে  এবং দিন দিন তা বৃদ্ধি পাচ্ছে । যার উদাহরণ হিসেবে সম্প্রতি সিলেট, হবিগঞ্জ  ও নোয়াখালীর ঘটনাসমূহের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।আমরা ইতিহাস ঘেটে জানতে পারি যে জাতিসংঘ ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর নারীর প্রতি সবধরনের সহিংসতা বন্ধ করার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৯৮১ সালে লাতিন আমেরিকায় নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ বিষয়ক এক সম্মেলনে ২৫ নভেম্বরকে আন্তর্জাতিক নারী প্রতিরোধ দিবস পালনের ঘোষনা দেওয়া হয়। দিবসটি স্বীকৃতি পায় ১৯৯৩ সালে বিশ্ব মানবাধিকার সম্মেলনে। ১৯৯৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘ দিবসটি পালনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। ১৯৯৪-৯৫ সালে কায়রো এবং বেইজিংয়ে নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল নারীর  প্রতি সহিংসতা কমানো।

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বাংলাদেশে যে সমস্ত আইন রয়েছে তা হলো - এসিড সন্ত্রাস আইন -২০১২,  বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইন- ১৯২৯, যৌতুক প্রতিরোধ আইন - ১৯৮০,  নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন -২০০০ ( সংশোধনী ২০০৩),  পারিবারিক সহিংসতা আইন -২০১০, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ  আইন ২০১২, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি - ২০১১, ঢাকা মহানগর পুলিশ অধ্যাদেশ- ১৯৭৬,  বাংলাদেশ দন্ডবিধির ২৯৪, ৪৯৩ এবং ৫০৬ধারা (তথ্য সংগৃহীত মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম ভাইয়ের টাইম লাইন থেকে)।কিন্তু এত আইন থাকা সত্বেও নারী ঘরে-বাইরে  সর্বত্র কী নিরাপদ হতে পেরেছেন?

নির্মম হলেও সত্য যে তারা নিরাপদ হতে পারেননি। বন্ধ হয়নি নারী নির্যাতন। এসিড সন্ত্রাস, যৌন নির্যাতন, ইভটিজিং, যৌতুক, ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, পারিবারিক সহিংসতা, অপহরণ, পর্নোগ্রাফী ইত্যাদির মাধ্যমে তারা প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। জাতিসংঘের তথ্য মতে বিশ্বের ৩৫ শতাংশ নারী তার জীবদ্দশায় মানসিক বা শারিরীক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশের ৮৭ শতাংশ  বিবাহিত নারীই আপন গৃহে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন।

বর্তমানে দেশে আলোড়িত একটি মহামারী ভাইরাস "করোনার" সাথে পাল্টাপাল্টিভাবে দেশে লড়ছে ধর্ষন নামক আরেকটি ভয়ংকর ভাইরাস। তবে করোনার সাথে এই ভাইরাসের পার্থক্য হচ্ছে  করোনা ভাইরাস নারী- পুরুষ উভয়ের প্রাণহানি করে কিন্তু ধর্ষন নামক ভাইরাসটি শুধু নারীদের ইজ্জতসহ প্রাণহানি ঘঠায়।এমনকি অনেকসময় মৃত্যুর আগেও ধর্ষণ নামক মহামারিটি হাজারবার নারীকে মৃত্যুতে ধাবিত করে আবারো মৃত্যু ঘটায়। ধর্ষণ বর্তমানে বাংলাদেশসহ  সারাবিশ্বে ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে সামনের দিকে আগাচ্ছে ।

ধর্ষণের অনেক ঘটনা  প্রকাশ হলেও আবার অনেক  ঘটনা  লোকচক্ষুর অন্তরালেই  থেকে যায়।কেননা অনেক ধর্ষিতা লোকসমাজে লজ্জার ভয়ে ধামাচাপা দিয়ে রেখে দেয়। বর্তমানে আমাদের দেশে  ধর্ষণ  নিত্যদিনের সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে । আর এরুপ হয়ে উঠার কারন হচ্ছে ধর্ষকদের বিরুদ্ধে বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা থাকার কারন। আজ যদি ধর্ষকদের আইনের কঠোর ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রকাশ্যে ফাঁসির রায় কার্যকর করে ফাঁসি দেওয়া হত তাহলে আজ দেশে ধর্ষণের হার এভাবে  বৃদ্ধি পেত না।

ধর্ষণের প্রভাবে অনেকসময় দেখা যায় ধর্ষিতা নারী অবিবাহিত হলেও তার বিবাহ অনিশ্চিত হয়,আবার দেখা যায়  ধর্ষিতা নারী   বিবাহিতা হলেও তার বিবাহিত জীবনে নেমে আসে অশান্তির কালোছায়া। অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক অসঙ্গতি, চক্ষুলজ্জা, সমাজের অগ্রহনযোগ্যতা, আইনের প্রতি অনাস্থা, ক্ষমতার অভাব ইত্যাদি কারনে অধিকাংশ ধর্ষন অপ্রকাশিত থাকে। আবার অনেকেই লোকচক্ষুর ভয় এবং লজ্জায় মামলা করার জন্য থানা যেতে অনিহা প্রকাশ করেন। আর করবেই না কেন? এখন পর্যন্ত ধর্ষণের সঠিক বিচার পেয়েছে কোনো ধর্ষিতা নারী? বিচারহীনতার সংস্কৃতি, দীর্ঘবিচারসূত্রিতা ইত্যাদি কারনে বাদীপক্ষ অনেক সময় ন্যায় বিচার হতে বঞ্চিত হন। অনেক সময় ধর্ষণ মামলায় সমাজের উচ্চবিত্ত প্রভাবশালীরা জড়িত থাকায় অভিযুক্তদের সাজা নিশ্চিত করা কঠিন হয়।

ধর্ষণের বিচারহীনতার কারণ হিসেবে বাদীপক্ষ এবং আদালত পুলিশের তদন্তে গাফিলতি এবং ত্রুটির প্রসঙ্গটি বরাবরই সামনে আনেন। থানায় মামলা করা থেকে শুরু করে ভিকটিমের সঙ্গে আচরণ, তদন্ত এবং অপরাধীকে গ্রেফতার ইত্যাদি সবক্ষেত্রেই পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। এটা ঠিক কখনও কখনও কিছু অসৎ পুলিশ কর্মকর্তা তদন্তে গাফিলতি প্রদর্শন কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। তাই বলে ঢালাওভাবে পুলিশকে দায়ী করা ঠিক হবেনা।

অনেক সময় বাদি এবং সাক্ষীগন আসামিদের দ্বারা প্রভাবিত হন। সেক্ষেত্রে বাদি মামলা চালাতে অপরাগ হন কিংবা আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য হাজির হননা। আবার হাজির হলে ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেন। তাদের এধরনের ভূমিকায় আসামিরা পার পেয়ে যায়। তাছাড়া ধর্ষকরা প্রভাবশালী হলে তারা বাদীকে নানাভাবে প্রভাবিত করে মামলায় সমঝোতার চেষ্টা করে। ধর্ষণ বৃদ্ধি হওয়ার অন্যতম কারন হচ্ছে "বিচারহীনতা" নামক শব্দটি দেশে প্রচলিত থাকায়। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারনে অপরাধীরা সাজা পায়না বলেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ একে সহজ ও স্বাভাবিক ব্যাপার বলেই ধরে নিয়েছে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বা বিচার হলে সামাজিক এই দৃষ্টিভঙ্গিও ধীরে ধীরে পাল্টাবে। নারী নির্যাতন রোধে চাই কঠোর প্রতিবাদ ও সামাজিক আন্দোলন। নারী নির্যাতনকারীদের সনাক্ত,প্রতিরোধ ও বিচারের দাবীতে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনসাধারনকে এগিয়ে আসতে হবে ।

লেখক:
মোঃমনসুর আলম নিরব 
শিক্ষার্থী
শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
সিলেট ।

No comments

Powered by Blogger.