মৃত্যু -মোঃ নাজমুল হুদা ফাহিম


মৃত্যু -মোঃ নাজমুল হুদা ফাহিম

বৃষ্টি যে কতটা অস্বস্তিকর হতে পারে, রাসেলের মুখের দিকে এক পলক তাকাতেই উপলব্ধি করা যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোকাল বাসে করে বাসার দিকে রওনা দিতে না দিতেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। একগাদা লোক ভর্তি বাসে সব জানালা আটকানো, দম বন্ধ হয়ে আসছে । ভ্যাপসা গরমের মধ্যে, সস্তা কাচের ভেঙে যাওয়া জানালার ফাক গলে বৃষ্টির ঝাপটা এসে তার বাম হাতটা ভিজিয়ে দিচ্ছে। কখন বাসায় গিয়ে পৌঁছাবে তার অপেক্ষা। জীবনের অস্বস্তিকর, কঠিনতম সময়ে সেকেন্ডগুলো যেন ঘন্টায় পরিণত হয়, তেমনি সুখকর মুহূর্তগুলো নিমেষে উধাও হয়ে যায়।

রুমের পাশের বারান্দায় চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে রাসেল। পাশের ছোট টেবিলে এক মগ কফি রাখা আছে। চশমার কাচের ভেতর দিয়ে বৃষ্টিস্নাত প্রকৃতিকে শিল্পীর নিখুঁত শিল্পকর্ম মনে হচ্ছে তার। গন্ধে তার সতেজতা, রঙে তার বৈচিত্র্যতা, শব্দে তার ছন্দময়তা, স্পর্শে শুভ্র শীতল মাতালতা।
- রাসেল
হঠাৎ মায়ের ডাকে ঘোর ভাঙল তার
- আসছি মা......
- শোন, তোর করিম চাচা নাকি একটু আগে মারা গেছেন।
- কি বলছ তুমি!
- হ্যা রে, তোর চাচার ছেলে আরফাত মালয়েশিয়া থাকে বউ বাচ্চা নিয়ে, সে নাকি বাবাকে দেখতে আসবেনা, তার নাকি জরুরী কাজ আছে। কেমন ছেলে !
- আরফাত ভাই আসবেনা!

রাসেল যেন কারেন্টের শক খেল। করিম উদ্দিন তার বাবার দুঃসম্পর্কের ভাই। রুমে গিয়ে নিজের ব্যক্তিগত ডায়রিটা হাতে নিয়ে কি যেন খুজতে লাগল সে । হঠাৎ একটা পাতায় এসে তার চোখ স্থির হল। অনেকদিন আগে লিখে রাখা কথাগুলো পড়তে শুরু করল। লেখাগুলো মোটামুটি এরকম....

হোস্টেলে থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। খুব ব্যস্ত সময় পার করছি। গতকাল রাতে নাতাশা আপুর কাছ থেকে জানতে পারি সোহেল চাচা মারা গেছেন। আজ সকাল ১০ টায় আমার হোস্টেলের পাশেই জানাজা হবে জানতে পেরে, জানাজার মিনিট বিশেক আগে গিয়ে হাজির হলাম। সব নিয়মকানুন সম্পন্ন করে জানাযা শুরু হবে হবে । এমন সময় হটাৎ একটা লোক উচু গলায় বলে উঠল, " হুজুর কোথায়? ১০টা বেজে ২ মিনিট হয়ে গেল! ১০ টায় জানাযা হওয়ার কথা, দেরি করছেন কেন? তাড়াতাড়ি শেষ করে দেন নামাজ, আমার জরুরী কাজ আছে।" একজন কাছের মানুষ মারা গেছে তার শূন্যতা কি অনুভব করছেন না লোকটা! কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। নিষ্ঠুর পৃথিবীতে যার যত বেশি আছে তার শুভাকাঙ্ক্ষীও ততো বেশি। কিন্তু তিনি মারা গেলে শুভাকাঙ্ক্ষীরা তার জন্য ২ মিনিট বেশি দাড়িয়ে থাকতেও নারাজ। বেঁচে থাকতে সবার জন্য সবকিছু করে যাওয়া মানুষটি আজ মারা যাওয়াতে যেন মূল্যহীন হয়ে পড়লেন। চিৎকার করে অতিব্যস্ত হওয়া লোকটির নিজ পরিবারের কেউ নন হয়ত ইনি, তাই বলে মানবতা নাই! উনিও কি একদিন মারা যাবেন না!

ডায়রি বন্ধ করল রাসেল। লেখাটি বছর খানেক আগের। সেদিন ২ মিনিট অতিরিক্ত দাড়িয়ে থাকতে অপারগতা প্রকাশকারী নিষ্ঠুর ব্যক্তিটি আজ একটু আগে মারা গেছেন।

কিছু কথা রাসেলের মাথায় ঘুরতে থাকে ....
এই সুন্দর পৃথিবীতে কেন এত অশান্তি? কেন এত লোভ, হিংসা, অহংকার? কারো কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া ২বিঘা সম্পদ মৃত্যুর পর সাথে করে নিয়ে যাওয়ার কোন অবকাশ নেই। শূণ্য হাতে চলে যেতে হবে। কারো মৃত্যুকে তুচ্ছ করে নেয়ার সুযোগ নেই, বরং শিক্ষা নিতে হবে। কারন, সেই মৃত্যু যে একদিন ঘুরেফিরে সবার কপালেই জুটবে। যখন থাকবনা তখন মানুষ হয় আমদের কৃতকর্মের গল্প করে আমাদের প্রশংসা করবে; নয়তো কুকর্মের জন্য আমাদের তাচ্ছিল্য করবে। আমরা কি আমাদের অনুপস্থিতিতে মানুষের প্রশংসনীয় গল্পের হিরো হতে পারিনা !

লেখক:
মোঃ নাজমুল হুদা ফাহিম
শিক্ষার্থী, ফার্মেসী বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

No comments

Powered by Blogger.