করোনাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের অনলাইন ব্যবসা


করোনাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের অনলাইন ব্যবসা

বৈশ্বিক মহামারী করোনা স্বাভাবিক জীবন ধারাকে বদলে দিয়েছে পুরোপুরি। পরিবর্তনের বাতাস পৌঁছে দিয়েছে প্রায় প্রতিটি স্তরে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক কাঠামো কিংবা রাজনৈতিক গতিধারায়ো এসেছে সময়োপযোগী পরিবর্তন। পরিবেশ হয়েছে নিস্তব্ধ বা জনশূন্য, কর্মহীনতায় মানুষ হয়েছে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আবদ্ধ। জীবন রূপ নিয়েছে জেলখানার মতো বদ্ধ অবস্থায়। মোটাদাগে বলতে গেলে দুটি কারণে মানুষের মধ্যে ঘরবন্দী থেকেও অনলাইন কেন্দ্রিক ব্যবসা করার মতো সুদূরপ্রসারী চিন্তা জন্মেছে। প্রথমত, অর্থাভাব সাময়িক ভাবে দূর করা। দ্বিতীয়ত, শখের বসে কিংবা সময় কাটানোর তাগিদে।

জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বিশেষত ফেসবুক'কে প্লার্টফর্ম হিসাবে ব্যবহার করছেন এধরনের কাজের সাথে সংশ্লিষ্টরা। যাদের প্রায় ৯০% তরুণ প্রজন্মের অন্তঃর্ভুক্ত। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাধারণত এ ধরনের কাজে বেশী মাত্রায় ঝুঁকে পড়েছেন। অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে যারা নিজের প্রয়োজনীয় খরচ নিজে যোগান। স্বাভাবিক পৃথিবীতে সেই খরচের বড় একটি অংশ আসতো টিউশনি থেকে কিংবা পার-টাইম জব থেকে।

সংশ্লিষ্ট অনেকের সাথেই কথা বলে জানা যায় নিজের অর্জিত অর্থ তাঁরা নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি পারিবারিক প্রয়োজনেও হস্তান্তর করতে পারতো। পরিমান বিবেচনায় গড় করলে বলা যায়, এ ধরনের শিক্ষার্থীরা ৫-৭ বা অনেক ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকা অব্দিও আয় করতো। জীবনযুদ্ধে নামার আগেই যেন শুরু হয়ে যেত তাঁদের সংগ্রামকেন্দ্রিক টিকে থাকার সময়োপযোগী দৃঢ় চেষ্টা। পড়াশোনা, কাজকর্ম সবকিছু শত কষ্ট সামলানোই ছিল তাঁদের নিত্যনৈমিত্তিক রুটিন। এসবের মাঝেও যেন খুঁজে পেত তাঁরা তৃপ্তির ঢেকুর।

বাস্তবতা বলি কিংবা ভাগ্যর নির্মম পরিহাস কোভিড -১৯ বদলে দিয়েছে সমস্ত সমীকরণ। তাই সময়ের প্রয়োজনে টিকে থাকার প্রয়াসে কিংবা শখ বা সময় কাটানোর তাগিদে অনেকেই নেমে পড়েছেন অনলাইন সেক্টরে নিজের প্রতিভা বিকাশে বা ক্ষুদ্র উদ্যক্তা হিসাবে জীবন গড়ার স্বপ্ন নিয়ে। তাঁদের বিক্রিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে, মেডিকেল সামগ্রী, বিশেষত, মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার নানান রকমের পোশাক, অনেকে খাবার বিক্রিকেও লাভজনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে এই অনলাইন ব্যবসার মাধ্যমে। নিত্য প্রয়োজনীয় প্রায় সবক্ষেত্রেই পৌঁছে গেছে তাঁদের সময়োপযোগী সার্ভিসের ছোঁয়া৷ এতে যেমন লাভের মুখ দেখছেন ব্যবসায়ীরা তেমনী গ্রাহক পাচ্ছেন ঘরে বসে তৃপ্তির খোঁজ। বিরূপ পরিস্থিতিকেও তাঁরা যেন করে তুলেছেন সাময়িক ভাবে সোনালী৷ যদিও স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে পুরোপুরি ভিন্ন তবুও অনেকটা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর চেষ্টা।

তেমনই কিছু মানুষের সাথে পরিচয় করানো গেলে আপনার স্বপ্নজালোও বিস্তৃত হবে বলে আমার বিশ্বাস। চলুন জানা যাক;-
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫ তম ব্যাচ ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী লাবণ্য কুমার রায় বাপ্পী করোনার শুরু থেকে অবস্থান করছেন নিজ শহর ঠাকুরগাঁও জেলাতে। নতুন কিছু করার ইচ্ছা থেকে ঝুঁকে পড়েন অনলাইন ব্যবসাতে। সে লক্ষ্য করে, এই করোনাকালীন সময়ে সকলেই অনলাইনে অনেক বেশি সময় ব্যয় করছে। আর পরিস্থিতির কারণে অন্য সময়ের মতো নিজেদের প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই এদিক সেদিক গিয়ে সংগ্রহ করতে পারছে না লোকজন। তাই লাবণ্য ,তাঁর বন্ধু কৌশিক এবং তাঁর মামা ধীরেন্দ্রনাথ মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় কোনো কিছু নিয়ে কাজ করার বিষয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করে। সেই ধারাবাহিকতায় Three Sense Fashion নামক পেজ খোলেন যেখানে পোশাক নিয়ে কাজ শুরু করেন।

লাবণ্য কুমার রায় বাপ্পী
লাবণ্য কুমার রায় বাপ্পী
স্বত্বাধিকারী:Three Sense Fashion

তাঁদের অনলাইন ব্যবসার উদ্দেশ্যে হলো নতুন কিছু করা এবং নতুন কিছু শেখা। তাঁদের মূলমন্ত্র-ই হলো "We business not for earning, just for learning" । তাঁদের পেজের এক মাস পূর্ণ হয়েছে এর মধ্যে। এই পর্যন্ত তাঁদের পেজ থেকে প্রায় অর্ধ-শতাধিক বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার লোক প্রয়োজনীয় পণ্যটি সংগ্রহ করেছে। এতো অল্প সময়ে প্রায় অর্ধশত মানুষের সাথে যুক্ত হতে পারাই লাবণ্য, কৌশিকদের সফলতা, তার চেয়ে বড় সফলতা হলো নতুন অনেক কিছু শিখতে পারা, জানতে পারা, যা তাঁদেরকে আগামী দিনে পথ চলতে বা নতুন কিছু উদ্ভাবনে প্রেরণা জোগাবে বলে তাঁদের অন্তঃনিহিত বিশ্বাস। সকলের ভালোবাসা ও আশীর্বাদ পেলে, এই অনলাইন বিজনেসকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান লাবণ্য।

অন্যদিকে, আনিকা অথৈ সিম্মি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাদারীপুর জেলায় বাড়ি। টিউশনি করে পড়ালেখা ও পরিবারের অাংশিক খরচ চালাতো সে। ছোট ভাই, দিনমজুর বাবা ও মায়ের সংসারে সে একটুখানি সুখের প্রয়াসে নিজের মতো চলার চেষ্টা করতো। বিরূপ পরিস্থিতি সমীকরণ বদলে দিয়েছে। নানা চিন্তাভাবনা করে সামান্য কিছু অর্থ ধার নিয়ে সে শুরু করে প্রয়োজনীয় মেডিকলে সামগ্রীর ব্যবস্থা। তাঁর প্রেরিত দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, নাপা জাতীয় ঔষধ এবং অন্যান্য মেডিকেল প্রোডাক্ট। শুরু তে তেমন একটা সাড়া পায় নি তবে সময়ের দোলাচলে একটু একটু করে বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যবসার পরিধি। প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম হয়েছেন প্রায় শতাধিকের চেয়েও বেশী মানুষের। এভাবেই চলছে তাঁর দিন, এখন অপেক্ষা সোনালী সময়ে আবার ফিরে যাবার।

করোনা পরিস্থিতি ঘোলাটে করে দিলেও সাময়িক ভাবে কিছু করে দেখানোর সুযোগ করে দিয়েছে লাবণ্য, সিন্নিদের৷ এই পথ চলার সূচনা থেকেই হয়তো তাঁরা একদিন পা বাড়ানোর সাহস পাবে বাস্তব জীবনের ব্যবসা শিল্পে। নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবে "মিলিয়ন ডলারের উদ্যোক্তা "হিসাবে। শুভ কামনা নিরন্তর তাঁদের আগামীর তরে। এগিয়ে যাক তাঁরা সমৃদ্ধির সোপানে। জীবন হোক আলোকিত, করোনা হোক পদানত।

লেখক:
অনন্য প্রতীক রাউত
শিক্ষার্থী,আইন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

No comments

Powered by Blogger.