যে গল্প চোখে পানি নিয়ে আসে ....


যে গল্প চোখে পানি নিয়ে আসে

টেকনিক্যাল মোড় থেকে একটু সামনে এপ অন করে দাড়ায়ে রইছি৷ রাত প্রায় ১০টা বাজে তখন।

হাতে ছোট একটা কাপড়ের ব্যাগ আর টুপি পাঞ্জাবী পড়া এই ছেলে এসে জিজ্ঞাসা করতেছে, ভাই ঘাটে যাবেন? 

উত্তরে জিগাইলাম, কোন ঘাট? 

বললো সদরঘাট। 

আমি পাঠাও ইউজার এপ ওপেন করে দেখলাম ভাড়া আসে ১৯০ টাকার মত। 

তারে বললাম, আমি তো এভাবে কাউকে নেই না। এপের মাধ্যমে নেই শুধু। আপনার এপ আছে? 

কিছু না বলে অন্য দিকে চলে গেল৷ আমি ডেকে বললাম, চুক্তিতে গেলেও ১৭০-৯০ টাকার বেশি যায়েন না৷ এরকম ভাড়া আসবে৷ 

সে আমার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজনের সাথে কথা বললো৷ সম্ভবত ওনার সাথেও মিলে নাই৷ তাই হাটা দিল সামনের দিকে৷ 

একটু পর দেখলাম সে হাটতেছে৷ বাসেও উঠে না, আবার বাইকেও উঠে না৷ 

এপ বন্ধ করে তার সামনে গিয়া বললাম, উঠেন৷ পল্টন পর্যন্ত যেতে পারবেন আমার সাথে৷ আমি ওদিকেই যাব। ভাড়া লাগবে না৷ 

একটা স্মিত হাসি দিয়েই থ্যাংকিউ বলে বাইকে উঠা ধরলো৷ আমি বললাম আগে হেলমেটটা পড়ে নেন৷ 

হেলমেট পড়ায়ে বাইকে উঠাইলাম। তারপর পল্টনের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। 

পথিমধ্যে অনেক কথা হইলো৷ 

মিরপুরে একটা ফার্নিচারের দোকানে মিস্ত্রি হিসাবে কাজ করে৷ মায়ের অসুস্থতার খবরে জরুরী ভিত্তিতে আজকেই চাঁদপুর যাচ্ছে তিনদিনের ছুটি নিয়ে৷ 

জিজ্ঞাসা করলাম, আমার পরে পিছনে আরেকজনকে যে জিগাইলেন ওনি ভাড়া কত চাইলো? উত্তর দিল ১৫০ টাকা৷ 

সে ১২০ টাকা পর্যন্ত বলছে কিন্তু রাজী হয়নি৷ তাই হাটা দিছে। এমনিতেই অনেক কষ্ট করে ঢাকায় থেকে কাজ শিখতেছে।  বেশি টাকা খরচ করা সম্ভব না৷ অনেকটা হিসেব করেই চলতে হয়৷ 

পরে জিগাইলাম, বাসেও তো উঠলেন না৷ যেতেন কিভাবে? 

আল্লাহর নামে হাটা দিছিলাম৷ ব্যাবস্থা একটা হইতো৷ বাসে উঠতে পারি না। বমি আসে শুধু৷ 

মাঝপথে আরো অনেক কথাই হলো৷ তার লঞ্চের শেষ সময় ১১টা ১৫ মিনিট৷ 

ঘড়িতে তখন ১০টা ১৫ বাজে৷ আমরা বিজয় সরণি সিগন্যাল ক্রস করলাম৷ 

সে একটু চিন্তিত মনে প্রশ্ন করলো ভাইয়া যেতে পারবো তো? 

এই সময়টায় গুলিস্তানে প্রচুর জ্যাম থাকে৷ তারে পল্টন নামায়ে দিলে হয়তো বাকি পথ আবার বাইকেই উঠতে হবে৷ তারপর মনে মনে প্ল্যান চেঞ্জ করলাম যে সদরঘাটেই নামায়ে দিব আর উত্তর দিলাম হ্যা যেতে পারবেন৷ কোন সমস্যা নাই৷ 

সে তখনো জানে তাকে পল্টনেই নামায়ে দিব আমি৷ 

পল্টন পার হয়ে গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট পার হয়ে যাচ্ছি৷ তারপর প্রচুর জ্যাম ঠেলে সদরঘাট এসে নামালাম ১০টা ৪৯ মিনিটে৷ তার লঞ্চ তখনো ছেড়ে যায়নি৷ অপেক্ষায় আছে।   

নামার পর পকেট থেকে টাকা বের করতেছে৷ সে হয়তো ভাবছে আমি অন্তত ১২০ টাকা হলেও নিব৷ যেহেতু তারে একদম শেষ লোকেশনে নিয়া আসছি৷ 

আমি বললাম টাকাটা আপনার কাছেই রাখেন৷ মায়ের জন্য কিছু নিয়েন৷ আমাকে দিতে হবে না৷ 

এবার তার মুখের হাসিটা কেমন যেন ছিল৷ আমি নিজেই তার হাসির মায়ায় পড়ে গেছি৷ 

সে খুশি হয়েছে তবে কিভাবে প্রকাশ করবে বুঝতে পারতেছে না৷ তার হাসিতে ব্যাপারটা স্পষ্ট ফুটে উঠতেছিল বারেবার। 

আমি দ্রুত ওখান থেকে চলে আসলাম৷ আবেগ চলে আসলে সমস্যা। চোখে পানি এসে যাবে৷ আবেগকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। 

সম্ভবত ১৯০ টাকা খুব বড় একটা এমাউন্ট না৷ তবে এই মুহূর্তে আমার কাছে এই টাকাটা কমও না। বাইকার হিসেবেই তারে রাইডটা দিলাম। 

আমি জানি না সে ভবিষ্যতে কি হবে৷ তবে কখনো যদি সফল ব্যাবসায়ী বা এরকম কিছু হয় আর সে তার স্ট্রাগলের গল্প শেয়ার করে কারো সাথে৷ 

তাহলে নিশ্চয় আমার নামটা আলাদা করে বলবে। আমি এইটুকুতেই খুশি! 

রাতের ঢাকায় এরকম কত গল্পই তো থাকে৷ আজকের গল্পটা না হয় আমিই শেয়ার করলাম!

লেখক:
মোঃ মেহেদী আলম
শিক্ষার্থী, ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং
গ্রিন ইউনিভার্সিটি

No comments

Powered by Blogger.