বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার সময় এখনই

বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার সময় এখনই

ইউজিসিতে মোবাইল ফোন কেনার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আট হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী শিক্ষা ঋণ নেওয়ার জন্য আবেদন করেছে। এ আবেদন অনলাইনে হওয়ায় অনেকে এ খবর পায়নি পর্যন্ত। অনেকে পরবর্তীতে এ ঋণ যথা সময়ে শোধ করতে পারবে কিনা এ চিন্তাতে আবেদন করেনি। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ডিপার্টমেন্টে এ সংক্রান্ত কোন নোটিশ দেয়নি বলে ঐ ডিপার্টমেন্টের যেসব শিক্ষার্থীর মোবাইল নেই তারাও শিক্ষা ঋণের জন্য আবেদন করতে পারেনি। এ থেকেই বুঝা যায় ডিভাইসবিহীন শিক্ষার্থীর সংখ্যা আট হাজার থেকে অনেক বেশি। এছাড়াও এই ঋণ শিক্ষার্থীরা একটা দীর্ঘসময় পর পাবে। তখন হয়তো দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করে দিবে।

এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে অগ্রাহ্য করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিভাবে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেছে তা আমার বুঝে আসে না।

এই করোনাকালীন সময়ে অর্থনৈতিক আর স্বাস্থ্যের ক্ষতি নিয়ে যতটা আলোচনা হচ্ছে, ততটা শিক্ষার ক্ষতি নিয়ে হচ্ছে না; বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষার। 

২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের অনেক শিক্ষার্থীর অনার্স শেষ হওয়ার কথা ২০১৯ সালে। নানা কারণে কিছু পরীক্ষা ২০২০ এ গড়ায়। পরবর্তীতে করোনার জন্য আর সেসব পরীক্ষা না হওয়ায় এসব শিক্ষার্থীদের অনার্সও শেষ হয়নি। কবে এদের অনার্স শেষ হবে তাও কেউ জানে না। এত গেল শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের কথা। এরকম অন্যান্য বর্ষের অনেকেরই বিভিন্ন পরীক্ষা আটকে আছে। কারও হয়তো দুই একটা বিষয়ের ফাইনাল পরীক্ষা, কারও ভাইভা। 

পরীক্ষা আটকে থাকা মানেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক অনিশ্চয়তা বিরাজ করা। এবছর এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জেএসসি এবং এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করেছে। সেটা কতটা যৌক্তিক তা নিয়েও শিক্ষাবিদদের মতবিরোধ রয়েছে। তারপরেও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তা দূর করেছে সরকার। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটুকু ভাবছে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে? 

বেশকিছু দিন ধরেই বিভিন্ন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় খোলার ব্যাপারে আন্দোলন করছে। শুরুতে এরকম শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম হলেও এখন অধিকাংশ শিক্ষার্থীই বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ক্যাম্পাস খোলার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করছে। পরিবারের চাপ, অনিশ্চয়তা আর হতাশা থেকে মুক্তি পেতে এর বিকল্প আর কিছু দেখতে পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা।

করোনায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সারা দেশে সব প্রতিষ্ঠানের মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল দীর্ঘদিন। তারপর একে একে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলেনি। অল্প বয়স্ক শিক্ষার্থীরা অসচেতনতার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের জন্য অনিরাপদ হলেও উচ্চ শিক্ষার শিক্ষার্থীদের সে ঝুঁকি নেই। সব স্তরের শিক্ষার্থীদের এক পাল্লায় মাপা যুক্তিসঙ্গত নয়। 

আমাদের সময় এসেছে দেশের উচ্চ শিক্ষা নিয়ে ভাবার। কিভাবে শিক্ষার্থীদের আবার ক্লাসে ফেরানো যায় কিংবা শিখন-শেখানো কার্যক্রমে ফেরানো যায় সেটা নিয়ে ভাববার সময় এখনই। যাতে সকল শিক্ষার্থীকে শিখন কার্যক্রমে আনা যায়। আংশিক শিক্ষার্থীর কারণে বড় একটা অংশ যাতে পিছিয়ে না পড়ে সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।

অনেকেই বলবেন অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের কথা। কিন্তু দেশের সব প্রান্তে একই রকম নেটওয়ার্ক না থাকা কিংবা অনলাইনে অংশগ্রহণের সামর্থ্য সবার না থাকার কারণে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। অনলাইন ক্লাসগুলোতে উপস্থিতির হার খুবই কম। কয়েকজন উপস্থিত হলেও ক্লাসে অধিকাংশরই সক্রিয় উপস্থিতি দেখা যায় না। ভিডিও অফ রেখে অনেকে নিউজফিড স্ক্রলে ব্যস্ত থাকে; কিংবা যারা মনযোগী থাকে তারাও নেটওয়ার্ক সমস্যার জন্য শিক্ষকের সব কথা স্পষ্টভাবে শুনতে পায় না। মাঝেমধ্যে দেখা যায় ক্লাসের মাঝখানে বিদ্যুতবিভ্রাটের জন্য শিক্ষক বা শিক্ষার্থী ক্লাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছেন। এ জন্য সরাসরি ক্লাসরুমে শিক্ষার্থী ফেরানোর কোন বিকল্প নেই আমাদের দেশে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নোটিশ দিয়েছেন, তারা দুই সেমিস্টার অনলাইনে শেষ করে পরবর্তীতে একসাথে পরীক্ষা নিবে। এটা মোটেও যৌক্তিক কোন সিদ্ধান্ত নয়। একটা সেমিস্টারে শুধুমাত্র লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয় না। এসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, ফিল্ড ওয়ার্ক ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়। দুই সেমিস্টারের মূল্যায়ন একসাথে করতে গেলে শিক্ষার্থীদের উপর অমানবিক চাপ দেওয়া হবে। ছয় মাস আগের সেমিস্টারের মূল্যায়ন ছয় মাস পরে করলে সেটা কতটুকু সঠিক মূল্যায়ন হবে?

উচ্চ শিক্ষার সাথে যারা জড়িত তাদের উচিত অল্প অল্প করে হলেও উচ্চ শিক্ষার কার্যক্রম চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া। 

প্রথমে হল খুলে পরীক্ষা নেওয়া শুরু করতে হবে। এভাবে যাদের পরীক্ষা আটকে আছে তাদের পরীক্ষা শেষ হলে শ্রেণী শিখন কার্যক্রম অনলাইনে শুরু করতে হবে। এক্ষেত্রে কিছু শিক্ষার্থী যাদের এলাকায় নেটের সমস্যা তারা হলে বসে নেটের মাধ্যমে শিক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে। যাদের ডিভাইসের সমস্যা তারা তার কোন সহপাঠীর ডিভাইসের মাধ্যমে শিক্ষায় অংশ নিতে পারবে। বা শিক্ষক চাইলে অল্প কয়েকজন শিক্ষার্থী  নিয়ে ক্লাসেই ক্লাস করবেন। সাথে অনলাইন ব্যবস্থাও রাখবেন। যাতে করে যারা অনলাইনে ক্লাস করতে চাইবে, বা যাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে তারা যেন শিখন কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত থাকেন। এভাবেই সকল শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যাবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকি সবকিছু দেশে স্বাভাবিক রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান অল্প অল্প খোলার কারণে আজ সম্পূর্ণ খুলতে পেরেছে। এসব খোলার কারণে দেশে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি হবে বলা হয়েছিল, তেমনটি হয়নি। বরং সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে ঢাকার ৪৮ শতাংশ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ে ভালো হয়ে গেছেন; যারা টেরও পাননি। এসব দিক বিবেচনা করে উচ্চ শিক্ষার শিক্ষার্থীদের পাশে সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই। বাকি সব প্রতিষ্ঠানের মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম অল্প করে হলেও শুরু করা দরকার।  শিক্ষা কার্যক্রমের ক্ষেত্রে আমাদের বাকি সবকিছুর মতই এগোনো উচিত।

লেখক:

মোঃ কাউছার আলম

শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

No comments

Powered by Blogger.