সময় এখন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবার


সময় এখন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবার
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবনা চিন্তা এদেশে বেড়েছে এক যুগের বেশি আগে নয়। এক সময় মানুষ ভাবতো খাদ্য, বস্ত্রসহ মৌলিক চাহিদা মিটলেই যথেষ্ঠ, বাকি সব মনের খাম খেয়ালিপনা ছাড়া আর কিছুই নয়! সময় বদলেছে, সাইকোলজি নামক স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের রহস্যময় শাখা আমাদের বুঝতে শিখাচ্ছে 'মন' নামক ব্যাপারটি কোন চাট্টিখানি কথা নয়, এর সুস্থতা এবং অসুস্থতা রয়েছে । যার পরোক্ষ প্রভাব দৈহিক স্বাস্থ্যেও পরিলক্ষিত হয়, বলা চলে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্তক।

স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে 'প্লাসিবো’ নামক একটি মজার টার্ম আছে, যেখানে ঔষধ না দিয়েও ঔষধের মোড়কে সাধারণ কোন তরল ব্যবহার করে বেশ কিছু অসুখের চিকিৎসা করা হয় শুধুমাত্র রোগীকে ঔষধ দেওয়া হচ্ছে এই তথ্যটি ব্যাবহার করে। এতেই প্রমাণিত হয় মনো-দৈহিক সূক্ষ সম্পর্ক। প্রতিবছরের মত এবারেও ১০ অক্টোবর পালিত হবে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস । কিন্তু এই দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য কতটুকু অনুধাবন করতে পারছে সমাজ ?

এখনো মানুষিক কোন সাময়িক সমস্যার সমাধানে সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে না যাওয়ার কারণ শুধুমাত্র 'পাগল' মানুষজন এরূপ বিশেষজ্ঞের চেম্বারে যায় এরূপ ভুল ধারণা সমাজে অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত। ফলে গড়ে উঠেছে অনেক অপেশাদার মেন্টাল কন্সাল্টেন্সি, কাউন্সেলিং সেন্টার যেখান ভুল পরামর্শ নিয়ে অনেকেই ডেকে আনছেন মানষিক বিপর্যয়। আর ঘুমের ঔষধসহ বিভিন্ন এডিকটিভ নারকোটিক্সের অবৈধ ব্যবহার আমাদের দেশে এখনো প্রচলিত। অথচ একজন ফার্মাসিস্টের তত্ত্বাবধানে বিদেশে বৈধ প্রেস্ক্রিপশানের মাধ্যমে এসব ঝুঁকিপূর্ণ ঔষধ জনগণের হাতে পৌছে।

এ দিবসটি আমাদের প্রতিবছরই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বারংবার স্মরণ করিয়ে দেয় এবং তা হলো শারীরিক যত্নের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত মানসিক সুস্থতার প্রতি খেয়াল রাখা। এ ব্যাপারে সার্বজনীন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুসারে কিছু মৌলিক করণীয় অভ্যাস করা যেতে পারে। যেমন:
১। একটি সুনির্দিষ্ট রুটিন তথা কর্ম-সময় পরিকল্পনায় জীবন পরিচালনার চেষ্টা করা।
২| বর্তমানের কাজে, মূর্হতে নিজেকে অধিক মনোযোগী করা। স্ট্রেস মেনেজমেন্ট, মাল্টি টাস্কিং প্রভৃতি বিষয় সমূহে স্বচ্ছ ধারণা অর্জন করা।
৩| অতীত, ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি না ভাবা। চারপাশের প্রকৃতি, পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে তা উপভোগের চেষ্টা করা।
৪| বই পড়া, লেখা, বিতর্ক, আবৃত্তি, পাব্লিক স্পিকিং, খেলাধূলা, আর্ট তথা বিভিন্ন  সৌখিন কাজের সাথে নিজেকে যুক্ত রাখা। প্রয়োজনের অতিরিক্ত যান্তিকতা, ইনটারনেট, পিসি গেমস বর্জন করা।
৫| ক্ষমা করা, অতীত থেকে প্রকৃত শিক্ষা নিয়ে সামনে ধাবিত হওয়া, সহনশীলতা-সচ্চরিত্রের অনুশীলন, সাধ্য অনুযায়ী সহযোগীতা-সহমর্মিতা জীবনকে অনেকাংশে সহজ করে দেয়।
৬| কোন ট্রমা/অবসাদ/ডিপ্রেশন কাটাতে অবশ্যই বিশেষজ্ঞগণের সাথে পরামর্শ করা
৭| অনর্থক জটিলতার চেয়ে সরল কিন্তু অর্থবহ জীবন মূল্যবান, বন্ধু নির্বাচন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অহেতুক কোন নেতিবাচক কর্মকান্ড-বাক্য হতে দূরত্ব বজায় রাখা।
৮| নিজেকে জানার চেষ্টা করা, তুলনা না করে ধৈর্য সহকারে প্রতিনিয়ত আত্নউন্নয়ন সাধন করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কেননা, সৃষ্টিকর্তা প্রতিটি মানুষের ইনটিলিজেন্ট প্যাটার্ন ভিন্ন করেছেন, তাই এই প্যাটার্ন বুঝতে পারার ভেতরেই জীবনের স্বার্থকতা নিহিত। প্রতিদিন কিছু সময় সম্পূর্ণ নীরবতা, ধ্যানের মাধ্যমে কাটানোর গুরুত্ব এক্ষেত্রে অপরিসীম।
৯| অবশ্যই শারীরিক সুস্থতা বিধির ব্যাপারে সচেতন হওয়া। নিয়মিত শরীর চর্চা চালিয়ে যাওয়া। অসুস্থ শরীর কখনো প্রফুল্ল মন উপহার দিতে পারেনা!
১০| প্রিয়জনের পাশাপাশি কিছু অবসর অসহায়, অসুস্থ, অপরিচিত মানুষদের সাথে ব্যয় করলে অর্ন্তদৃষ্টির ব্যপ্তি ঘটে। পাশাপাশি পথশিশু, প্রাণী, দুস্থ দরিদ্র মানুষের সাধ্যমত সেবা অনেকাংশে আধ্যাত্নিক প্রশান্তির পথ প্রশস্ত করে।
১১| নিজ নিজ ধর্ম পালনের ব্যাপারে মনোযোগী হওয়া, ধর্মীয় অনুশাসনের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করে জীবন ধারণ করা। জগতে ধার্মিকরা সুখী।

সর্বোপরি, এসব ছোটখাটো কিন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় অভ্যাসে রপ্ত করে নেওয়া হলে অনেকাংশেই মানসিক চাপ মুক্ত থাকা যায় যার প্রভাব দৈনন্দিন জীবনেও প্রতিফলিত হয়। মনের জানালা এত বড় করে রাখা যেনো তাতে একটুকরো মেঘ আসলেও ঘুটঘুটে আঁধার না নামে, আলো আসবেই সময়ের দোলাচালে । শুধু কিছু অপেক্ষা আর বিশ্বাস দরকার। করোনাকালীন সময় আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব বেশ ভালোভাবেই চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়েছে। পারস্পরিক ভালোবাসায় একটি সুন্দর, সুস্থ এবং মানবিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠুক।

লেখক:
সাজিদুল হক সাদ
সাজিদুল হক সাদ
শিক্ষার্থী
ডিপার্টমেন্ট অব ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেস
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি 

No comments

Powered by Blogger.