মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং নির্বাচনের ইতিহাস


মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং নির্বাচনের ইতিহাস

কিছুদিনের মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন। সেই নির্বাচনের জোয়ারে যেন ভাসছে গোটা মার্কিন মুলুক , শুধু মার্কিন মুলুক বললে ভুল হবে গোটা বিশ্ব। বিভিন্ন আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে পক্ষে-বিপক্ষে। প্রার্থীরা একে অপরকে ঘোল খাওয়ানোর সর্বশেষ সুযোগটুকু প্রয়োগ করছে বিভিন্ন বিষয়কে সামনে নিয়ে আসার মাধ্যমে। বিশ্বের বাঘা বাঘা সব জার্নাল , নিউজ পোর্টাল এবং অনুসন্ধানী সাময়িকীগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে কে হতে যাচ্ছে আগামী দিনের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কান্ডারী তথা বিশ্ব মোড়ল রাষ্ট্রের প্রধান "কিছুটা উগ্র, খ্যাপাটে ট্রাম্প নাকি কিছুটা খোলা মনের বাইডেন?"

মার্কিন রাষ্ট্রপতি, শুনলেই যেন কেমন একটি জাঁকালো জাঁকালো ভাব আসে। তাইনা? বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশটির রাষ্ট্রপতি জাঁকালো জাঁকালো ভাব তো আসবেই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আমাদের মনের মধ্যে অনেক অদ্ভুত প্রশ্ন উকি দেয় বিভিন্ন সময়। যেমন: আব্রাহাম লিংকনের বাবা তো জুতো সেলাই এর কাজ করতেন তার পরেও তিনি রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন । তো তাহলে কি যে কেউ ইচ্ছা করলে মার্কিন রাষ্ট্রপতি হতে পারে এমনকি আমিও কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হতে পারি?

বারাক ওবামার বাবা তো একজন কেনিয়ার নাগরিক ছিলেন। তিনি কিভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন? ট্রাম্পের নামটা তো আগে কখনো শুনিনি কিভাবে হঠাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসে মার্কিন রাষ্ট্রপতি হলেন? শুনলাম হিলারি ক্লিনটন জনগণের ভোটে জিতে গেছে কিন্তু রাষ্ট্রপতি হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ।এটা আবার কেমন নিয়ম ? শুনলাম রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প "নির্বাচনী কলেজে" জিতে গেছে,তাই রাষ্ট্রপতি হয়েছে। সেটা আবার কেমন পদ্ধতি? তো বন্ধুরা এমন সব অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর দেয়ার মাধ্যমে আমাদের আজকের এই লেখাটি সাজানো হয়েছে।

প্রথম প্রশ্ন কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হতে পারবে?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে মার্কিন রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত দেয়া আছে। শর্ত তিনটি হচ্ছে:
  1. যদি কোন ব্যক্তি জন্মগতভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হন। (যদি কোন মার্কিন মহিলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাহিরে সফরে থাকা কালে কোন সন্তান জন্মদান করেন তাহলে ওই শিশুও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্মগত নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবেন)।
  2. তিনি ৩৫ বছর বয়স পূর্ণ করেন।
  3. তিনি ১৪ বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তাহলে যে কেউ, জনগণ চাইলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হতে পারেন।

এই কারণে রাষ্ট্রপতি ওবামার বাবা কেনিয়ার নাগরিক হওয়ার পরেও যেহেতু তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এজন্য রাষ্ট্রপতি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।

আব্রাহাম লিংকন জন্মগতভাবে অনেক নিচু (সমাজের চোখে) শ্রেণীতে জন্মগ্রহণ করার পরেও রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকার পরেও উক্ত শর্ত পূরণ করার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন।
তো আপনিও চেষ্টা করতে পারেন আপনি যদি উক্ত শর্ত গুলো ইতোমধ্যে পুরোন করে থাকেন তাহলে আপনিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হতে পারেন, যদি মার্কিন জনগণ চায়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি কি?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন প্রক্রিয়া বুঝতে হলে আপনাকে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে।
🔸ককাস: ককাস একটি স্থানীয় সভা যেখানে কোন শহর, কাউন্টিতে একটি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধিত সদস্যরা তাদের পছন্দের দলের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য এবং অন্যান্য দলের ব্যবসায় পরিচালনার জন্য জড়ো হন। জাতীয় দলীয় সম্মেলনে প্রতিনিধি বাছাই করার জন্য প্রাথমিক নির্বাচনের বিকল্প একটি ককাস। রাজনৈতিক দলের প্রার্থী নির্ধারণের জন্য ১৬ টি রাজ্যে ককাস রয়েছে।

নিন্মের রাজ্যে গুলোতে ককাস পদ্ধতি বিদ্যমান আছে: লউয়া,নেভাদা,সাউথ ক্যারোলিনা,নিউ হ্যাম্পশায়ার ইত্যাদি।
🔸 সুপার টুইসডে:যেদিন অধিকাংশ রাজ্যেগুলো প্রাথমিক নির্বাচন এবং ককাসের আয়োজন করে থাকে সে দিনকে "সুপার টুইসডে "বলা হয় ।
🔸নীল রাজ্যে:ডেমোক্র্যাটদের প্রাধান্য দেওয়া রাজ্যে গুলোকে বলা হয় নীল রাজ্যে।ডেমোক্র্যাট প্রাধান্য পাওয়া রাজ্যেগুলো যেমন: ক্যালিফোর্নিয়া, ইলিনয়, এবং উত্তরপূর্ব এলাকার রাজ্যেগুলোকে বলা হয় নীল রাজ্যে।
🔸লাল রাজ্যে:আমেরিকান নির্বাচনে রিপাবলিকান দুর্গ বলে পরিচিত এই রাজ্যেগুলোকে বলা হয় 'লাল রাজ্যে'। রিপাবলিকান দুর্গ বলে পরিচিত রাজ্যে যেমন: আইডাহো, আলাস্কা, এবং দক্ষিণের অনেক রাজ্যকে বলা হয় 'লাল রাজ্যে'।
🔸ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্যে বা নির্বাচনী রণক্ষেত্র: আর কিছু রাজ্যে আছে যেগুলো বোঝা যায় না কোন দলকে সমর্থন করে সে রাজ্যেগুলোকে বলা হয় পারপল স্টেট বা বেগুনি রাজ্যে। 

নির্বাচনে প্রার্থীরা আসলে এই নির্দিষ্ট কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচনী ভোট জেতার জন্য লড়াই করেন। তাই প্রার্থীরা প্রচারনার সময় এমন ১০ - ১২ টি রাজ্যে দিকে মনোযোগ দিয়ে থাকেন - যেগুলো ঠিক নির্দিষ্ট কোন দলের সমর্থক হিসেবে পরিচিত নয়। এগুলোকেই বলে ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্যে বা নির্বাচনী রণক্ষেত্র। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আসল লড়াই হয় এ রাজ্যে গুলোতেই। আর এই অঙ্গরাজ্যে গুলোর ভোটই - শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়ায় জয় পরাজয়ের মুল চাবিকাঠি। এ রাজ্যেগুলোতে হয় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এসব রাজ্যে প্রচারনার বিনিয়োগ ও ব্যয় সবচেয়ে বেশি। এসব রাজ্যে ঘন ঘন চলে প্রার্থীদের আনাগোনা, তাদের প্রচারনা, সমাবেশ। নির্বাচনী সময়সূচির মধ্যে যেকোন সময়ে এই ব্যাটলগ্রাউন্ড বা নির্বাচনী রণক্ষেত্রে ভোটের অঙ্ক বদলে যেতে পারে। 

🔸 দোদুল্যমান রাজ্যে :
"ফাইভ থার্টি এইট" নামে আমেরিকার একটি নির্বাচন বিষয়ক ওয়েবসাইট, যারা জনমত জরিপ বিশ্লেষণ করে, তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কিছু অঙ্গরাজ্যে গত কয়েকটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বরাবরই "দোদুল্যমান রাজ্যে" হিসেবে আবির্ভূত হতে দেখা গেছে । দোদুল্যমান রাজ্যে হচ্ছে সেসব রাজ্যে যেগুলো প্রার্থীদের কারণে ভোট এদিকে বা ওদিকে যেতে পারে।
যেসব রাজ্যে বিজয়ী হওয়া সম্ভব নয়, অনেক সময় সেসব রাজ্যে প্রচারণা বিনিয়োগ বা প্রার্থীদের পাঠানো হয় না। ফলে ওহাইয়ো বা ফ্লোরিডার মতো দোদুল্যমান রাজ্যেগুলোকেই মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়।
২০২০ সালের এরকম দোদুল্যমান রাজ্যে হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে অ্যারিজোনা, পেনসিলভেনিয়া এবং উইসকনসিনকে।

🔸 নির্বাচনী কলেজ: নির্বাচনী কলেজ হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নির্বাচকদের একটি সংস্থা যা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের শুধুমাত্র রাষ্ট্রপতি এবং সহ-রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করার উদ্দেশ্যে প্রতি চার বছর অন্তর গঠিত হয়। নির্বাচনী কলেজটিতে ৫৩৮ জন ভোটার রয়েছে ।

🔸ফেইথলেস ইলেক্টর বা আস্থাহীন নির্বাচক: যে সকল নির্বাচনী কলেজ সদস্য তাঁদের রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের মতের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ভোট দেয় না তাদেরকে আস্থাহীন নির্বাচক বলা হয়। যদিও ১৫ টি রাজ্যে ও ওয়াশিংটন ডিসিতে আইন আছে , নির্বাচকগণ তাদের রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মত করেই ভোট দিতে হবে।

🔸 উইনার টেক অল অর্থাৎ বিজয়ী প্রার্থী সবগুলো পাবে:
যদি কোন দল কোন রাজ্যের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় ভোট পান তবে তারা সেই রাজ্যের নির্বাচনী কলেজের ভোটের সম্পূর্ণ অংশ পেয়েছেন বলেই ধরে নেয়া হবে। এটাকে বলা হয় "উইনার টেক অল"অর্থাৎ যদি কোন প্রার্থী কোন রাজ্যের মোট জনপ্রিয় ভোটে জয়ী হয় তাহলে ধরে নেয়া হবে যে, সে উক্ত রাজ্যের সমস্ত নির্বাচনী কলেজের ভোট গুলো পেয়েছ।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি নির্বাচনী কলেজ ক্যালিফর্নিয়া রাজ্যে :৫৫ টি ।হিলারি ক্লিনটন এ রাজ্যের যে কোনও প্রার্থীর চেয়ে বেশি জনপ্রিয় ভোট পেয়েছিলেন, এই কারণে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় ৫৫ জন নির্বাচকের সকলের ভোট পাবেন এই বলে বিবেচিত হবে।

যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্যালিফোর্নিয়ায় সাড়ে ৪ মিলিয়নেরও বেশি ভোট অর্জন করতে পেরেছিলেন কিন্তু এই সাড়ে ৪ মিলিয়ন ভোটের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন কোনো নির্বাচনী কলেজের ভোট অর্জন করতে পারেননি। অর্থাৎ ক্যালিফোনিয়া রাজ্যে ট্রাম্পের সাড়ে চার মিলিয়ন ভোটের বিপরীতে তাদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী কলেজের ভোট 0। জনপ্রিয় ভোটে যে প্রাথী জয়ী হয়েছেন তিনি সম্পূর্ন ৫৫ টি নির্বাচনী কলেজে জয় পেয়েছেন এটাই হচ্ছে উইনার টেক অল অর্থাৎ বিজয়ী ব্যক্তি সবগুলো জয় পেয়েছেন বলে গণ্য হবে ।

এখন আসা যাক মূল প্রক্রিয়ায়।
প্রথমে বলে রাখি, মার্কিন রাষ্ট্রপতি এবং সহ-রাষ্ট্রপতি জনগণের দ্বারা সরাসরি নির্বাচিত হয় না। পরিবর্তে, তারা "নির্বাচনী কলেজ" নামক একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে "নির্বাচক" দ্বারা নির্বাচিত হন। মার্কিন রাষ্ট্রপতির নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি পাঁচটি ধাপে একীভূত করা যেতে পারে -

প্রথম ধাপ :প্রাথমিক নির্বাচন ও ককাস
এমন অনেক লোক থাকতে পারে যারা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হতে চায়। মার্কিন সরকারের কীভাবে কাজ করা উচিত সে সম্পর্কে এই ব্যক্তিদের প্রত্যেকের নিজস্ব ধারণা থাকতে পারে। অনুরূপ ধারণাযুক্ত লোকেরা সাধারণত একই রাজনৈতিক দলের পিছনে দাঁড়ায়। তবে প্রথমে তাদের দলের সদস্যদের পক্ষে জয়লাভ করা দরকার।

প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা তাদের দলীয় সদস্যদের অনুকূলে জয় পেতে সারা দেশে প্রচারণা চালান।

রাজনৈতিক দলগুলি সাধারণ নির্বাচনের জন্য প্রার্থী বাছাই করতে এমন পদ্ধতিগুলি ব্যবহার করে যা প্রাথমিক নির্বাচন এবং ককাস নামে পরিচিত।

🔹প্রাথমিক নির্বাচন: একটি প্রাথমিক নির্বাচন হল একটি রাজ্য পর্যায়ের নির্বাচন যেখানে দলের সদস্যরা সেরা প্রার্থীকে ভোট দেন যারা সাধারণ নির্বাচনে তাদের প্রতিনিধিত্ব করবে। প্রাথমিক পর্যায়ে নির্বাচিত দলীয় প্রার্থীরা সাধারণ নির্বাচনে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৪ টি রাজ্য প্রাথমিক নির্বাচন পরিচালনা করে।

মার্কিন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরণের প্রাথমিক রয়েছে যেমন : খোলা প্রাথমিক এবং আধা-খোলা প্রাথমিক, বন্ধ প্রাথমিক এবং আধা-বন্ধ প্রাথমিক ইত্যাদি।

◾খোলা প্রাথমিক:
খোলা প্রাথমিক হল এমন একটি প্রাথমিক যাতে কোনও ভোটার যে কোনও দলের পক্ষে ভোট দিতে পারে, এমনকি ভোটার সেই দলের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত না হলেও। 

নিম্মক্ত রাজ্য গুলোতে খোলা প্রাথমিক বিদ্যামান আছে:আলাবামা, আরকানসাস, জর্জিয়া, হাওয়াই, মিশিগান, মিনেসোটা, মিসৌরি, মন্টানা, নর্থ ডাকোটা, দক্ষিণ ক্যারোলিনা, টেক্সাস, ভার্মন্ট, ভার্জিনিয়া এবং উইসকনসিন।

◾আধা-খোলা প্রাথমিক:
আধা-খোলা প্রাথমিকের ক্ষেত্রে, ভোটাররা এখানেও তাদের যে কোনও দলের প্রার্থী বাছাই করতে সহায়তা করতে পারেন এবং কোন নির্দিষ্ট দলের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হতে হবে না। তবে, ভোটাররা ভোট দেওয়ার সময় একটি দলের-নির্দিষ্ট ব্যালট নিতে হবে।

◾বন্ধ প্রাথমিক :
খোলা প্রাথমিকগুলির বিপরীতে, বন্ধ প্রাথমিকগুলি ভোটারদের নির্বাচন দিবসের আগে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি নির্দিষ্ট দলের সাথে নিবন্ধন করতে হবে। এর অর্থ হল ভোটাররা কোন দলের সাথে অনুমোদিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের ভোট দিতে পারবেন না।

নিন্মের রাজ্য গুলোতে বন্ধ প্রাথমিক নির্বাচন বিদ্যমান: কানেকটিকাট, ডেলাওয়্যার, ফ্লোরিডা, ক্যানসাস, কেন্টাকি, লুইসিয়ানা, মেইন, মেরিল্যান্ড, নেব্রাস্কা, নিউ মেক্সিকো, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া ,ওয়াইমিং এবং
আলাস্কা।

◾আধা-বন্ধ প্রাথমিক : 

আধা-বন্ধ প্রাথমিকের মধ্যে, নিষিদ্ধ ভোটাররা যে কোনও পক্ষেই তাদের পছন্দ অনুযায়ী ভোট দিতে পারেন। তবে ভোটারদের ব্যালট দেওয়ার আগে তাদের অবশ্যই কোনও দলের সাথে অনুমোদিত হতে হবে।

নিন্মের রাজ্য গুলোতে আধা-বন্ধ প্রাথমিক বিদ্যামান:
আলাস্কা, অ্যারিজোনা, ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, ইলিনয়, আইওয়া, ক্যানসাস, নিউ হ্যাম্পশায়ার, নিউ জার্সি, নর্থ ক্যারোলিনা, ওহিও, ওরেগন, রোড আইল্যান্ড, উটাহ এবং পশ্চিম ভার্জিনিয়া ।

🔹ককাস: একটি ককাস একটি স্থানীয় সভা যেখানে কোনও শহর, শহর বা কাউন্টিতে একটি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধিত সদস্যরা তাদের পছন্দের দলের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য এবং অন্যান্য দলের ব্যবসায় পরিচালনার জন্য জড়ো হন। জাতীয় দলীয় সম্মেলনে প্রতিনিধি বাছাই করার জন্য প্রাথমিক নির্বাচনের বিকল্প একটি ককাস। রাজনৈতিক দলের প্রার্থী নির্ধারণের জন্য ১৬ টি রাজ্য ককাস রয়েছে।

নিন্মের রাজ্যে গুলোতে ককাস পদ্ধতি বিদ্যমান আছে: লউয়া,নেভাদা,সাউথ ক্যারোলিনা,নিউ হ্যাম্পশায়ার ইত্যাদি।

প্রাইমারি নির্বাচন এবং ককাস প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলের স্বাতন্ত্র্য বিষয়। প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দল আলাদা আলাদাভাবে অথবা একসাথে প্রাথমিক নির্বাচন এবং ককাসের আয়োজন করতে পারে। আর যেদিন অধিকাংশ স্টেটগুলো প্রাথমিক নির্বাচন এবং ককাসের আয়োজন করে থাকে সে দিনকে "সুপার টুইসডে "বলা হয় ।

দ্বিতীয় ধাপ: প্রতিটি দলের স্বতন্ত্র জাতীয় সম্মেলন
প্রতিটি রাজ্যে প্রাথমিক এবং কক্কাস সমাপ্ত হলে, একটি জাতীয় সম্মেলন হয় যেখানে একটি দলের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মনোনয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে জনগণের কাছে ঘোষণা করা হয়।এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণত "লউয়া"রাজ্যে আয়োজন করা হয়ে থাকে।যে সম্মেলনে প্রত্যেক নির্দিষ্ট দলের পুরোধা ব্যক্তিত্ব (সাবেক রাষ্ট্রপতি, সাবেক সহ- রাষ্ট্রপতি ,সাবেক দলপ্রধান এবং দলের স্পিকার ইত্যাদি)উপস্থিত থাকেন প্রাথমিক নির্বাচনে এবং ককাসে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেয় এবং সর্বাধিক প্রতিনিধিরা যাকে সমর্থন করেন তিনি ওই দল থেকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান।

এক পক্ষের রাষ্ট্রপতি মনোনীত প্রার্থী বাছাই চূড়ান্ত করার জন্য প্রতিটি দল একটি জাতীয় সম্মেলন করে। প্রতিটি সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী একজন চলমান সাথী (উপ-রাষ্ট্রপতি প্রার্থী) নির্বাচিত করেন। সম্মেলনের সমাপ্তি সাধারণ নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরুর দিকে চিহ্নিত করে।

তৃতীয় ধাপ: সাধারণ নির্বাচনী প্রচারণা
প্রতিটি রাজনৈতিক দল থেকে একক মনোনীত প্রার্থীকে নির্বাচিত হওয়ার পরে, প্রাথমিক, ককাস এবং জাতীয় সম্মেলনের শেষে সাধারণ নির্বাচনের প্রচার শুরু হয়।

এই প্রার্থীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণ করে, সাধারণ জনগণের কাছে তাদের মতামত এবং পরিকল্পনাগুলি ব্যাখ্যা করে এবং সম্ভাব্য ভোটারদের সমর্থন জয়ের চেষ্টা করে। সমাবেশ, বিতর্ক এবং বিজ্ঞাপন সাধারণ নির্বাচনী প্রচারের একটি বড় অংশ।

🔹বিতর্কের মাধ্যমেই মূলত নেতার যোগ্যতা, বিচক্ষণতা ও জ্ঞানের পরিধি পরিমাপ করা যায়। এই যুক্তির ওপর ভিত্তি করেই দীর্ঘদিন থেকে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডিবেট চলে আসছে। নির্বাচনের কিছুকাল আগে (সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে) রাষ্ট্রপতি প্রার্থীদের মাঝে তিনটি এবং সহ- রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর মাঝে একটি ডিবেট অনুষ্ঠিত হয়। এই টেলিভিশন ডিবেট একটি স্বাধীন কমিশন কর্তৃক পরিচালিত হয়। এর মাধ্যমে প্রার্থীরা নিজেদের বিষয়সূচি ও যুক্তি পেশ করেন। নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর জয়-পরাজয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ বিতর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভোটারদের পাশাপাশি পুরো পৃথিবী তখন এ বির্তকের দিকে দৃষ্টি রাখেন।

রাষ্ট্রপতি বিতর্ক ইতিহাসে দেখা যায়, সর্বপ্রথম ১৮৫৮ সালে সিনেটর নির্বাচনে ডগলাসের সঙ্গে প্রথম প্রকাশ্যে বিতর্কে অবর্তীর্ণ হন আব্রাহাম লিংকন। তবে ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪০ সালে ওয়েনডেল উইলকির সাথে বিতর্কের চ্যালেঞ্জ নিতে অস্বীকার করেন।

মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাসে স্টুডিও বিতর্কের প্রথম প্রবেশ ঘটে ১৯৬০ সালে। শিকাগোর স্টুডিওতে রিপাবলিকান প্রার্থী রিচার্ড নিক্সনের সঙ্গে বিতর্কে অংশ নেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জন এফ কেনেডি। এরপর থেকেই মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সঙ্গে স্টুডিও বিতর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত।''

চতুর্থ ধাপঃ সাধারণ নির্বাচন (জনপ্রিয় ভোট)
এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্য অনুসারে নির্বাচনী বছরের নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের আশু মঙ্গলবারে অনুষ্ঠিত হয়।

আমাদের দেশে যেমন ৩০০ টি সংসদীয় আসনে প্রত্যেক দল তাদের নির্দিষ্ট প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয়ার মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ঠিক তেমনি ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ৫৩৮ টি নির্বাচনী কলেজ আছে আপনি বলতে পারেন এক একটি নির্বাচনী কলেজ এক একটি নির্বাচনী এলাকা আর যিনি উক্ত এলাকায় নির্বাচিত হন তাকে মূলত "নির্বাচক" হিসাবে গণ্য করা হয় যেমন আমাদের সংসদীয় আসন এবং এমপি।আর নির্বাচনী কলেজের সংখ্যা ৫৩৮ টি হওয়ার কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংসদ দুই কক্ষ বিশিষ্ট। সিনেট (উচ্চকক্ষ )যার সদস্য ১০০ জন এবং হাউস ওফ রিপ্রেজেন্টেটিভ( নিন্মকক্ষ)যার সদস্য ৪৩৫ জন দুইটা মিলে(১০০+৪৩৫)=৫৩৫+৩{ওয়াশিংটন ডিসির( ডিস্ট্রিক্ট অফ কলম্বিয়া) ৩ জন প্রতিনিধি}=৫৩৮।আর কোন রাজ্য থেকে কতটি নির্বাচনী কলেজ হবে এটি নির্ধারিত হবে ওই রাজ্য থেকে কতজন সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কংগ্রেসে প্রতিনিধিত্ব করছে।

অনেক আধুনিক ভোটার জেনে অবাক হতে পারেন যে তারা যখন রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী বাছাই করতে ব্যালট বাক্সে পা রাখেন, তখন তারা প্রকৃতপক্ষে নির্বাচক নামে পরিচিত তাদের নির্দিষ্ট দলের প্রতিনিধির পক্ষে ভোট দিচ্ছেন। কারণ তারা (নির্বাচকগণ) পরবর্তীতে তাদের নির্দিষ্ট দলের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীকে ভোট দেয়ার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

দেশজুড়ে প্রতিটি রাজ্যের লোকেরা একজন রাষ্ট্রপতি এবং একজন উপ-রাষ্ট্রপতি কে ভোট দেয়। লোকেরা যখন তাদের ভোট দেয়, তারা আসলে নির্বাচক হিসাবে পরিচিত একদল লোকের মাধ্যমে নিজেদের দলের মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থীকে ভোট দেয়।

প্রতিটি রাজ্যের ভোটার এবং কলম্বিয়া জেলার ভোটাররা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনুমোদিত সাংবিধানিক সদস্য হওয়ার জন্য ভোটারদের পক্ষে ভোট দেয়। এই ভোটাররা নির্বাচনী কলেজ গঠন করে।

একজন নির্বাচক নির্বাচনী কলেজের সদস্য। রাজ্যগুলি দ্বারা নিযুক্ত এই ভোটাররা সমর্থন করেছেন এমন রাষ্ট্রপতি প্রার্থীদের সমর্থন করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

পঞ্চম ধাপ: নির্বাচনী কলেজ
পঞ্চম ধাপ হচ্ছে নির্বাচনী কলেজ পর্ব অর্থাৎ চূড়ান্ত নির্ধারনী পর্ব। এটি ডিসেম্বর মাসে হয়ে থাকে। নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত নির্বাচনী কলেজের সদস্যগণ সাধারণত তাদের নির্দিষ্ট দলের (যে দল থেকে সে নির্বাচনী কলেজ জিতেছিল) রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন প্রার্থী কে তার মূল্যবান ভোট প্রদান করেন।

যে সকল নির্বাচনী কলেজ সদস্য তাঁদের রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের মতের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ভোট দেয় না তাদেরকে আস্থাহীন নির্বাচক বলা হয়।

যদিও ১৫ টি রাজ্যে ও ওয়াশিংটন ডিসিতে আইন আছে , নির্বাচকগণ তাদের রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মত করেই ভোট দিতে হবে।

কিন্তু বাকি রাজ্যগুলোর নির্বাচনী কলেজ সদস্যগণ বাধ্য নয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় তার নির্দিষ্ট দলের রাষ্ট্রপতি প্রার্থীকে ভোট প্রদান করার জন্য অর্থাৎ সে যে দল থেকে নির্বাচিত হয়েছে ওই দলের রাষ্ট্রপতি কে ভোট দেয়ার জন্য সে বাধ্য নয় এবং সাংবিধানিকভাবে তার উপরে কোন দায়বদ্ধতা নাই। যদি সে চায় যে,সে যে দল থেকে নির্বাচিত হয়েছে তার বিপরীত দলের রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন প্রার্থী কে ভোট প্রদান করবে তাহলে সেটি সে পারবে ।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ম্যারিল্যান্ডের কোন নির্বাচক ডেমোক্র্যাট পার্টি থেকে নির্বাচক নির্বাচিত হয়ে চূড়ান্ত ভোটের সময় ভোট দিল রিপাবলিকান রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীকে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্বাচনী কলেজের সদস্যগণ তাদের আস্থা অনুসারে তাদের নির্দিষ্ট দলের রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন প্রার্থী কে ভোট প্রদান করেন কিন্তু তিনি বাধ্য নন তাকে ভোট প্রদান করতে তিনি চাইলে বিপরীত দলকে ভোট প্রদান করতে পারেন। এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ৫৮ টি নির্বাচনের মধ্যে ৫৩ টিতে (প্রায় ৯১ শতাংশ) জাতীয় জনপ্রিয় ভোটের বিজয়ী নির্বাচনী কলেজের ভোটও বহন করেছেন।

এ বছরের জুলাই মাসে এ বিষয়ে এক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, যে কোন রাজ্য চাইলেই ওয়াশিংটন ডিসি এবং বাকি 15 টি রাজ্যের মত ঐ ধরনের আইন করতে পারে।

মেইনি এবং নেব্রাস্কা রাজ্য ছাড়া কোন প্রার্থী যদি কোনও রাজ্যের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় ভোট পান তবে তারা সেই রাজ্যের নির্বাচনী কলেজের ভোটের সম্পূর্ণ অংশ পেয়েছেন বলেই ধরে নেয়া হবে। এটাকে বলা হয় "উইনার টেক অল"অর্থাৎ যদি কোন প্রার্থী কোন রাজ্যের মোট জনপ্রিয় ভোটে জয়ী হয় তাহলে ধরে নেয়া হবে যে সে উক্ত রাজ্যের সমস্ত নির্বাচনী কলেজের ভোট গুলো পেয়েছ।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি নির্বাচনী কলেজ ক্যালিফর্নিয়া রাজ্যে: ৫৫ টি ।হিলারি ক্লিনটন এ রাজ্যের যে কোনও প্রার্থীর চেয়ে বেশি জনপ্রিয় ভোট পেয়েছিলেন, এই কারণে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় ৫৫ জন নির্বাচকের সকলের ভোট পাবেন এই বলে বিবেচিত হবে।

 যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্যালিফোর্নিয়ায় সাড়ে ৪ মিলিয়নেরও বেশি ভোট অর্জন করতে পেরেছিলেন কিন্তু এই সাড়ে ৪ মিলিয়ন ভোটের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন কোনো নির্বাচনী কলেজের ভোট অর্জন করতে পারেননি। অর্থাৎ ক্যালিফোনিয়া রাজ্যে ট্রাম্পের সাড়ে চার মিলিয়ন ভোটের বিপরীতে তাদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী কলেজের ভোট 0। জনপ্রিয় ভোটে যে প্রাথী জয়ী হয়েছেন তিনি সম্পূর্ন ৫৫ টি নির্বাচনী কলেজে জয় পেয়েছেন এটাই হচ্ছে উইনার টেক অল অর্থাৎ বিজয়ী ব্যক্তি সবগুলো জয় পেয়েছেন বলে গণ্য হবে ।

আপনি এটা ভাবতে পারেন না যে ,যে প্রার্থী সাধারণ নির্বাচনে জনগণের ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন তিনি রাষ্ট্রপতি হবেন কারণ মূলত রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয় ডিসেম্বর মাসের নির্বাচনী কলেজ এর ভোটের মাধ্যমে নভেম্বর মাসের সাধারণ নির্বাচনে জনগণের ভোটের মাধ্যমে নয়। যে প্রার্থী ৫৩৮ টি নির্বাচনী কলেজের ভোটের মধ্যে ২৭০টি ভোট পান, তিনিই হোয়াইট হাউজের দৌড়ে বিজয়ী হন।

এর ফলে প্রার্থীদের কাছে কিছু কিছু রাজ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ যেসব রাজ্যে জনসংখ্যা বেশি, সেসব রাজ্যে নির্বাচনী কলেজের ভোটও বেশি থাকে।
যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ মানুষ কোনও প্রার্থীকে ভোট দেয়, তার অর্থ এই নয় যে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হবেন। এমন উদাহরণ রয়েছে যেখানে জনপ্রিয় ভোটে জয়ী একজন প্রার্থী নির্বাচন হেরে গেছেন। এমন ঘটনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাসে পাঁচবার ঘটেছে।

ফলে কোন প্রার্থীর পক্ষে সাধারণ ভোটারদের বেশি ভোট পাওয়ার পরেও নির্বাচনী কলেজের ভোট কম পাওয়ায় হারতে হতে পারে। যেটা ঘটেছে ২০০০ সালে আল গোরের ক্ষেত্রে যিনি রিপাবলিকান পদপ্রার্থী ডব্লিউ বুশের থেকে জনপ্রিয় ভোট অনেক বেশি পেয়েছিলেন কিন্তু নির্বাচনী কলেজের ভোট কম পেয়েছিলেন এবং ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনের ক্ষেত্রে কারণ তিনিও নভেম্বর মাসের সাধারণ নির্বাচনে জনগণের ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন কিন্তু ডিসেম্বর মাসে নির্বাচনী কলেজের ভোটে ট্রাম্পের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। এর মাধ্যমে মূল নির্বাচন শেষ হয়।

জনগণের ভোট বেশি পাওয়ার পরেও একজন প্রার্থী যেভাবে নির্বাচনে পরাজিত হন?
যদি আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি রাজ্যের নির্বাচনী কলেজের ভোট বিবেচনা করি তাহলে দেখা যায় ক্যালিফোর্নিয়ায় ৫৫ টি, টেক্সাসে ৩৮ টি, নিউ ইয়র্কে ২৯টি, পেনসিলভেনিয়ায় ২০টি এবং ফ্লোরিডায় 29 টি নির্বাচনী কলেজের ভোট আছে। 

এখন ধরা যাক, ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটার সংখ্যা ১২০ লাখ, টেক্সাসের ভোটার সংখ্যা ৩০ লক্ষ , ফ্লোরিডার ভোটার সংখ্যা ২০ লক্ষ, নিউ ইয়র্কের ভোটার সংখ্যা ২০ লক্ষ এবং পেনসিলভেনিয়ার ভোটার সংখ্যা ২০ লক্ষ ।আগেই বলেছি যে প্রার্থী একটা নির্দিষ্ট রাজ্যের জনপ্রিয় ভোটে জয়ী হবেন তিনি ওই রাজ্যের সবগুলি নির্বাচনী কলেজের ভোট পেয়ে যাবেন।

এখন একটা হিসাবে আসা যাক উপরে উল্লেখিত পাঁচটি রাজ্যের মোট নির্বাচনী কলেজের সংখ্যা (৫৫+৩৮+১৯+২০+২৯)=১৭১ টি এবং মোট জনপ্রিয় ভোট ১২০+৩০+২০+২০+২০ লক্ষ=২১০ লক্ষ।
এখন বিবেচনা করি একজন ডেমোক্রেট পদপ্রার্থী যে জনপ্রিয় ভোটের সময় ক্যালিফোর্নিয়াতে ৮০ লক্ষ ,টেক্সাসে ১৩ লক্ষ ,নিউ ইয়র্কে ১৭ লক্ষ ,ফ্লোরিডাতে ৮ লক্ষ এবং পেনসিলভেনিয়াতে ৯ লক্ষ জনপ্রিয় ভোট পেল। তাহলে ওই প্রার্থী মোট জনপ্রিয় ভোট পেল ৮০+১৩+১৭+৮+৯ লক্ষ=১২৭ লক্ষ।

তিনি আলাদা আলাদা ভাবে দুইটি রাজ্যে {ক্যালিফোনিয়া (৮০ লক্ষ)এবং নিউ ইয়র্কে (১৭ লক্ষ)} জয়লাভ করেছেন এর অর্থ তিনি শুধুমাত্র ওই দুটি রাজ্যের নির্বাচনী কলেজের(৫৫+২৯=৮৪) ভোটগুলো পাবেন। অর্থাৎ তার নির্বাচনী কলেজের ভোট হবে (৫৫+২৯)=৮৪ টি ১২৭ লক্ষ জনপ্রিয় ভোটের বিপরীতে।

কিন্তু তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মোট জনপ্রিয় ভোট পেয়েছেন (২১০-১২৭)=৮৩ লক্ষ।কিন্তু তিনি আলাদা আলাদা ভাবে তিনটি রাজ্যে {টেক্সাস (১৭ লক্ষ), ফ্লোরিডা(১২ লক্ষ) এবং পেনসিলভেনিয়া (১১ লক্ষ) } জয় পেয়েছেন যার অর্থ ওই তিনটি রাজ্যের নির্বাচনী কলেজের (৩৮+২৯+২০=৮৭) সকল ভোটগুলো তিনি পাবেন। অর্থাৎ তাঁর নির্বাচনী কলেজের ভোট সংখ্যা হবে (৩৮+২৯+২০)=৮৭ টি মাত্র ৮৩ লক্ষ জনপ্রিয় ভোটের বিনিময়ে। 

এখনে দেখা যাচ্ছে একজন জনপ্রিয় ভোট পেল ১২৭ লক্ষ কিন্তু নির্বাচনী কলেজ ভোট পেল ৭৪ টি আবার অপরপক্ষে অন্যজন জনপ্রিয় ভোট পেল মাত্র ৮৩ লক্ষ কিন্তু নির্বাচনী কলেজের ভোট পেল ৮৭ টি। 

আমরা জানি যে মার্কিন রাষ্ট্রপতি প্রার্থী বেশি (২৭০ টি) নির্বাচনী কলেজের ভোট পাবে সেই প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। অর্থাৎ উপরিউক্ত ব্যাখ্যায় দ্বিতীয় ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন যদিও তিনি জনপ্রিয় ভোটে প্রথম  জনের থেকে ৪৪ লক্ষ ভোট কম পেয়েছেন। আর এভাবেই একজন প্রার্থী জনপ্রিয় ভোটে জয়লাভ করার পরেও মূল নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

নির্বাচনী ভোটে যদি কেউ বিজয়ী না হয়, তাহলে কী হবে?
যদি কোন একক প্রার্থী সংখ্যাগরিষ্ঠ (২৭০) নির্বাচনী ভোট না পান, তাহলে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা শীর্ষ তিন প্রার্থীর ভেতর থেকে একজনকে (প্রথমজনকে) রাষ্ট্রপতি হিসাবে বাছাই করবেন।

বাকি দুইজন প্রার্থীর ভেতর থেকে একজনকে সহ-রাষ্ট্রপতি হিসাবে বাছাই করবে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা। যদিও এরকম ঘটনা বিরল, তবে একবার এটা ঘটেছিল।১৮২৪ সালে এভাবেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জন কুইনসি অ্যাডামস।

ইউএস রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের স্বাভাবিক সময় বর্তিকা :
•ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে প্রাথমিক নির্বাচন এবং ককাস সম্পন্ন হয়।  
•জুলাই মাসে পার্টির জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
•সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নির্বাচনী প্রচারণা চলে। রাষ্ট্রপতি এবং সহ-রাষ্ট্রপতি প্রার্থীদের মধ্যে বিতর্কের আয়োজন করা হয়।
•নভেম্বরের প্রথম সোমবারের আশু মঙ্গলবার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ।
• ডিসেম্বর মাসের ১৪ তারিখে নির্বাচকগণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করার জন্য ভোট প্রদান করেন।
•মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস তার পরবর্তী বছর ৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির নাম ঘোষণা করে এবং ওই একই বছরের ২০ জানুয়ারি নতুন রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে বিভিন্ন যৌক্তিক কারণে এই সময় বর্তিকা ব্যাহত হতে পারে।

২০২০ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বার্তা:
এখনো পর্যন্ত বারাক ওবামার সাবেক চলমান সহ-রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন ডেমোক্রেটিক দল থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন এবং তিনি সাবেক ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর কমোলা হ্যারিসকে তার চলমান সহ-রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছেন এবং রিপাবলিকান দল থেকে বর্তমান রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প মনোনয়ন পেয়েছেন এবং বর্তমান সহ-রাষ্ট্রপতি মাইক পেন্সকে চলমান সহ-রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছেন। আগামী নভেম্বর মাসের ৩ তারিখ অর্থাৎ নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের আশু মঙ্গলবার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এখনো পর্যন্ত জনমত জরিপে ডেমোক্রেট পদপ্রার্থী জো বাইডেন এগিয়ে আছেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাস: 
এখনো পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫৮ টি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং ৪৫ জন আলাদা আলাদা ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।প্রথম রাষ্ট্রপতি জর্জ ওয়াশিংটন স্বতন্ত্র হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৭৮৯ এবং দুই মেয়াদে ১৭৯৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন, দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি জন অ্যাডামস ১৭৯৭ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি ১৮০১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন ,তৃতীয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে থমাস জেফারসন ১৮০১ সাল থেকে ১৮০৯ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।জন অ্যাডামসের নির্বাচনের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সমস্ত বিজয়ী দুটি বড় দলের একটিতে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তারপরে প্রতি চার বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচনী ভোটে বিজয়ী হয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হন। মার্কিন প্রথম রাষ্ট্রপতি জর্জ ওয়াশিংটনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে কোন প্রার্থী দুইবারের অধিক রাষ্ট্রপতি হতে পারেন না। তবে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে ডেমোক্রেট পদপ্রার্থী ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট (১৯৩৩-১৯৪৫) এর ক্ষেত্রে তিনি চার মেয়াদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন কিন্তু শেষ মেয়াদ পূর্ণ করার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। 

১৮০০ সাল থেকে রাষ্ট্রপতি এবং সহ-রাষ্ট্রপতি এর জন্য আলাদা আলাদা ভোটের ব্যবস্থা করা হয়। কারণ এটি একটি সমস্যা তৈরি করেছিল যখন ১৮০০ সালের নির্বাচনে অ্যারন বুড় টমাস জেফারসনের মতো সমান সংখ্যক নির্বাচনী কলেজের ভোট পেয়েছিলেন এবং জেফারসনের নির্বাচনকে অফিসে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। শেষ অবধি, হাউসে আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের প্রভাবের কারণে জেফারসনকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়েছিল।

নির্বাচনী কলেজের ইতিহাস:
ইতিহাসে পাঁচবার, রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীরা জনপ্রিয় ভোটে জিতলেও ইলেক্টোরাল কলেজে হেরে গিয়েছিল। যেমনটি ঘটেছিল সর্বশেষ 2016 সালের নির্বাচনে।
তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে কেন তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম থেকে এই বিশেষ পদ্ধতিতে বেছে নিয়েছিল আর কিইবা ছিল তার ইতিহাস। 

১৭৮৭ সালের সংবিধান প্রণয়ন সম্মেলনে প্রতিনিধিরা যে সকল বিষয়ে বিতর্ক করেছিল তার ভিতরে অন্যতম একটি বিতর্কের বিষয় ছিল কীভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন? নব রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা পিতৃবৃন্দ কয়েক মাস ধরে বিতর্ক করেছিলেন, কেউ কেউ যুক্তি দিয়েছিলেন যে কংগ্রেসকে রাষ্ট্রপতি বেছে নেয়া উচিত আবার অনেকেই গণতান্ত্রিক জনপ্রিয় ভোটের জন্য জোর দিয়েছিলেন। 

ফিলাডেলফিয়া সম্মেলনের সময়, বিশ্বের আর কোনও দেশই সরাসরি তার রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত করত না , তাই প্রতিনিধিরা অনির্ধারিত অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। কাজটিকে আরও জটিল করে তুলেছিল রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষমতার একটি গভীর অবিশ্বাসের কারণ। 

সর্বোপরি, নবজাতক দেশটি সবেমাত্র একটি অত্যাচারী শাসকের (ব্রিটিশদের) অধীনে থেকে মুক্তি পেয়ে উপনিবেশিক গভর্নরদের পরাস্ত করায় ব্যস্ত ছিল। তারা তাদের হাতে আর একটি স্বৈরশাসন চায় নি। তারা চেয়েছিল মুক্তি।

প্রতিনিধিদের একটি দল গভীরভাবে অনুভব করেছিল যে, রাষ্ট্রপতি বাছাইয়ের সাথে কংগ্রেসের কোন সম্পর্ক থাকা উচিত নয়। কারণ রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের ক্ষেত্রে কার্যনির্বাহী এবং আইনসভার সমঝোতায় দুর্নীতি সম্ভাবনা অনেক বেশি।

আবার প্রতিনিধিদের অন্য একটি দল গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন যে, সরাসরি জনগণের ভোটে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত করার ক্ষেত্রে অনেক গুলো সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, তারা ভেবেছিল ১৮ তম শতাব্দীর ভোটারদের প্রার্থীদের যোগ্যতা , বিশেষত গ্রামীণ ভোটাররা, সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত হওয়ার অভাব রয়েছে এজন্য তাদের দ্বারা যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা সম্ভব হবে না। দ্বিতীয়ত, তারা দেশকে বিপথে চালিত একটি শীর্ষ "গণতান্ত্রিক জনতার" ভয় পেয়েছিল। এবং তৃতীয়ত, জনসাধারণের কাছে সরাসরি আবেদন করা জনপ্রেমী রাষ্ট্রপতি বিপজ্জনক পরিমাণে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন যার ফলে তাদের স্বাধীনতা খর্ব করা হতে পারে।

এই বিতর্কগুলির মধ্যে "নির্বাচনী মধ্যস্থতাকারী"দের ধারণার ভিত্তিতে একটি আপস হয়েছিল।তাদের আপসটি "নির্বাচনী কলেজ " হিসাবে পরিচিত।এই মধ্যস্থতাকারীদের কংগ্রেস বা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত করা হবে না। পরিবর্তে, রাজ্যগুলি প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র "নির্বাচক" নিয়োগ দেবে যারা রাষ্ট্রপতির পক্ষে আসল ব্যালট দেবেন।
 
এবং যারা পরবর্তীতে রাজ্যগুলির জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করবেন। যার ফলে তারা তাদের মেধা ও প্রজ্ঞা দ্বারা যোগ্যপ্রার্থীকে বেছে নিতে পারবেন। এবং ক্ষমতার অপব্যবহার হওয়ার সুযোগ থাকবে না। 

সুতরাং এখান থেকেই মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচনের পরিবর্তে "নির্বাচনী কলেজ" নামক এই বিশেষ পদ্ধতি বেছে নিয়েছিল।
 

ভোট কেন নভেম্বরের মঙ্গলবারেই হয় ?
বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভোটারদের ভোট দেওয়ার হার সবচেয়ে কম। ব্যস্ততার কারণে এক-চতুর্থাংশেরও বেশি ভোটার ভোটকেন্দ্রে যান না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শুরুর দিকে ছুটির দিনে নির্বাচনের আয়োজন করে এলেও কোনো ভালো ফল মেলেনি।এরপর ১৮৪৫ সাল থেকে নভেম্বর মাসের প্রথম মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটের দিন নির্দিষ্ট করা হয়। ওই নিয়ম চালুর সময়টাতে যুক্তরাষ্ট্র ছিল কৃষিপ্রধান দেশ। ঘোড়ায় টানা গাড়িতে করে কাছের ভোটকেন্দ্রে যেতে অনেক সময় লেগে যেত কৃষকদের। শনিবার ছিল ফসলের মাঠে কাজের দিন। ধর্মকর্মের কারণে রবিবারও দূরে যাওয়া যেত না। আর বুধবার ছিল বাজারের দিন। মাঝখানে বাকি রইল মঙ্গলবার। এ কারণেই মঙ্গলবারকে ভোটের দিন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। আর মাস হিসেবে নভেম্বরকে বেছে নেওয়ার কারণ সে সময় নভেম্বর মাস পড়তে পড়তে যুক্তরাষ্ট্রে ফসল কাটা শেষ হয়ে যেত। নভেম্বর শেষ হতেই শীত নামত জাঁকিয়ে। তাই তো নভেম্বরকে ভোটের উপযুক্ত সময় হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।

ডেমোক্রেটিক দল :
ডেমোক্রেটিক দল ১৮২৮ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ডেমোক্র্যাটিক দলের আধুনিক উদারপন্থার দর্শন একটি মিশ্র অর্থনীতির সমর্থনে নাগরিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক সাম্যের ধারণা মিশ্রিত করে। কংগ্রেসে দলের প্রভাবশালী সেন্ট্রিস্ট, প্রগতিশীল এবং রক্ষণশীল উইংস রয়েছে। কর্পোরেট প্রশাসনের সংস্কার, পরিবেশ সুরক্ষা, সংগঠিত শ্রমের জন্য সমর্থন, সামাজিক প্রোগ্রামের রক্ষণাবেক্ষণ এবং সম্প্রসারণ, সাশ্রয়ী মূল্যের কলেজ টিউশন, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, সমান সুযোগ এবং ভোক্তা সুরক্ষা পার্টির অর্থনৈতিক কর্মসূচির মূল বিষয়।সামাজিক ইস্যুতে, এটি প্রচারাভিযানের অর্থ সংস্কার, এলজিবিটি অধিকার, ফৌজদারি বিচার ও অভিবাসন সংস্কার, কঠোর বন্দুক আইন, গর্ভপাতের অধিকার এবং গাঁজার বৈধকরণের পক্ষে রয়েছে।

এখনো পর্যন্ত পনেরো ডেমোক্র্যাট আমেরিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথথজন ছিলেন অ্যান্ড্রু জ্যাকসন, যিনি সপ্তম রাষ্ট্রপতি ছিলেন এবং তিনি ১৮২৯ থেকে ১৮৩৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সর্বশেষ ছিলেন বারাক ওবামা, যিনি ৪৪ তম এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি ছিলেন এবং ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এ পার্টির পুরোধা ব্যক্তিত্বদের ভিতরে ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি এন্ড্রু জ্যাকসন,উড্রো উইলসন, ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট , হেনরি এস ট্রুম্যান ,জন এফ কেনেডি , জিমি কার্টার,বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা প্রমুখ উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব।

রিপাবলিকান দল:
ক্যানসাস – নেব্রাস্কা আইন বিরোধী কর্তৃক ১৮৫৪ সালে জিওপি (গ্রান্ড ওল্ড পার্টি- রিপাবলিকান দলের পূর্ব নাম)প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা পাশ্চাত্য অঞ্চলগুলিতে দাসত্বের সম্ভাব্য সম্প্রসারণের অনুমতি দিয়েছিল। দলটি ধ্রুপদী উদারবাদকে সমর্থন করেছিল, দাসত্ব প্রসারের বিরোধিতা করেছিল এবং অর্থনৈতিক সংস্কারকে সমর্থন করেছিল।আব্রাহাম লিঙ্কন ছিলেন প্রথম রিপাবলিকান রাষ্ট্রপতি। লিংকন এবং একটি রিপাবলিকান কংগ্রেসের নেতৃত্বে ১৮৬৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

একবিংশ শতাব্দীর রিপাবলিকান দলের আদর্শ হল আমেরিকান রক্ষণশীলতা, যা উভয় অর্থনৈতিক নীতি এবং সামাজিক মূল্যবোধকে অন্তর্ভুক্ত করে। জিওপি কম কর, মুক্ত বাজারের পুঁজিবাদ, অভিবাসনের উপর বিধিনিষেধ, সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি, বন্দুকের অধিকার, গর্ভপাতের উপর বিধিনিষেধ, নিয়ন্ত্রণ ইউনিয়ন ও শ্রমিক ইউনিয়নের উপর বিধিনিষেধকে সমর্থন করে। এখনো পর্যন্ত ১৯ রিপাবলিকান আমেরিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন এবং বর্তমান রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি ২০১৬ সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এই দল থেকে পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকন,থিওডোর রুজভেল্ট, রিচর্ড নিক্সন , জেরার্ড ফোর্ড,রোনাল্ড রিগ্যান জজ এইচ ডব্লিউ বুশ এবং জজ ডব্লিউ বুশ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব।

প্রতীক কাহিনী:
যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান দলের প্রতীক গাধা ও হাতি। ডেমোক্রেটিক দলের নির্বাচনী প্রতীক গাধা আর রিপাবলিকান দলের নির্বাচনী প্রতীক হাতি। বরাবরের মতো এবারও এই দুই প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন জো বাইডেন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প। গাধা ও হাতি শব্দগুলো শতাব্দী প্রাচীন।

সম্ভবত, ১৮০০ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক কার্টুন নিয়ে লোকজন খুব চুলচেরা বিশ্লেষণ করত। এসব কার্টুন ইতিবাচক বা নেতিবাচক উভয় অর্থেই ব্যবহার হতো। যেমন— গাধা হতে পারে কষ্ট সহিষ্ণুতার প্রতীক, আবার একে হাস্যরস বা বোকার প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়। তেমনি হাতি হতে পারে মহান কিছু, আবার হতে পারে বোকা বা খারাপ কিছুর প্রতীক। রাষ্ট্রপতি এ্যান্ড্রু জ্যাকসন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম রাষ্ট্রপতি (১৮২৯-১৮৩৭)। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাকে গাধা বলে ডাকত। জ্যাকসন নামটি পছন্দ করেন এবং গাধাকে নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে বেছে নেন। একই সময়ে একজন কার্টুনিস্ট হাতিকে রিপাবলিকানদের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত মার্কিন নির্বাচনে ডেমোক্রেটদের নির্বাচনী প্রতীক গাধা আর রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রতীক হাতি।

অভিশংসন ঘটনা: 
এখনো পর্যন্ত তিন জন মার্কিন রাষ্ট্রপতি মার্কিন কংগ্রেস কর্তৃক অভিশংসনের শিকার হয়েছেন প্রথমত এন্ডু জনসন ১৮৬৮ সালে দ্বিতীয়ত বিল ক্লিনটন ১৯৯৮ সালে এবং তৃতীয়ত ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২০সালে। রিচার্ড নিক্সনকেও ১৯৭৪ সালে মার্কিন কংগ্রেস অভিসংশন করেন কিন্তু তিনি অভিশংসনের পূর্বেই পদত্যাগ করেন। উপরে উল্লেখিত বাকি তিনজনের কাউকে ক্ষমতা ছাড়তে হইনি কারণ তাদের চূড়ান্ত অভিশংসন এর জন্য মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষের (সিনেটের) অনুমোদন প্রয়োজন হয় আর যেহেতু তাঁরা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ছিলেন সেহেতু মার্কিন সিনেটে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল এজন্য সিনেট তাদের অভিসংশন আটকে দিয়েছিল। কিন্তু তারা প্রতিনিধি পরিষদ কর্তৃক অভিশংসিত হয়েছিলেন।

সুতরাং, এখন অপেক্ষার পালা যে,জো বাইডেন এবং ডেমোক্র্যাটদের বিজয় উল্লাস নাকি ২০১৬ সালের মতো সমস্ত আলোচনা-সমালোচনা জরিপ উল্টিয়ে ট্রাম্পের বিজয় এবং ডেমোক্রাটদের বুড়ো আঙ্গুল দেখান।

লেখক:
মূসা কলিমুল্লা
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

No comments

Powered by Blogger.