যুদ্ধাস্ত্র বিক্রির প্রস্তাবঃ ইতিহাস মোচনের নেপথ্যে বাংলাদেশ

যুদ্ধাস্ত্র বিক্রির প্রস্তাবঃ ইতিহাস মোচনের নেপথ্যে বাংলাদেশ

"ইতিহাসের স্রোতধারায় বালুকা রাশির মধ্যে স্বর্ণরেনুর মতো রাজনীতির বিজ্ঞাপন জমা হয়ে আছে"

-লর্ড একটন।

ইতিহাস হলো জাতির দর্পন স্বরুপ।যার সামনে দাঁড়ালে একটি জাতির অতীত বর্তমানের চিত্রপটটি দৃশ্যমান হয়।ইতিহাসের মধ্য দিয়েই কেবল একটি জাতি তার স্বরুপ উপলব্ধি,সংস্কৃতির সন্ধান ও আত্ম বিকাশের প্রেরণা পায়।

বাঙালি জাতির ইতিহাসে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ তেমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।যে অধ্যায়ের প্রতিটি পাতা জুড়ে আছে দমন-পীড়ন,বঞ্চনা সর্বোপরি বাঙালির আত্মত্যাগ বিসর্জন দিয়ে স্বাধীনতার মাইলফলকে পৌঁছানোর ইতিহাস।কিন্তু সেই ইতিহাসের ধ্বংসস্তুপ থেকে জাতির জিয়নকাঠি উদ্ধার না করে আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাহ্যিক উন্নয়নের নামমাত্র বিজ্ঞাপন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো বিদেশি কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিতে চায় সরকার।কারন এগুলো প্রাচীণ আমলের,অপ্রচলিত,অপ্রয়োজনীয় ও অব্যবহার্য।বানিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে,আট শ্রেণির মিলিয়ে মোট অস্ত্র আছে ২৭,৬৬২ টি।সবচেয়ে বেশি রয়েছে ০.৩০৩ রাইফেল যা মোট অস্ত্রের অর্ধেকের কাছাকাছি।অস্ত্র গুলো স্মৃতিচিহ্ন (অ্যান্টিক স্যুভেনিয়র)হিসাবে কিনতে চায় যুক্তরাষ্ট্রের ২টি ও সুইজারল্যান্ডের ১টি কোম্পানি।

যে অস্ত্র বাঙালি রক্তাক্ত ইতিহাসের পদচিহ্ন,বঞ্চনা-নীপিড়নের স্মৃতিচিহ্ন বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে সেই অস্ত্রগুলো স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উদযাপনের পঞ্চাশ বছর পালনের আগেই বিক্রি করতে হচ্ছে?রাষ্ট্র কি বহন করতে পারছেনা?এ স্মৃতিচিহ্ন বিলোপ মানে মুক্তিযুদ্ধের ডাকে সাড়া দিয়ে তরুন জনতা উৎক্ষিপ্ত পতঙ্গের মতো ঝাঁপিয়ে বিপ্লবের ঢেউয়ে ফেটে পরে যে কামান ধরেছিলে সেই ইতিহাস যা আমাদের সন্মানিত করে,স্বাতন্ত্রবোধ ও মর্যাদাবোধ প্রতিষ্ঠিত করে তারই স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলা।

বাঙালি জাতি হিসাবে ইতিহাস লালনকারী নয়, যুগে যুগে ক্ষমতার বলয়ে আচ্ছাদিত হয়ে বাঙালির ইতিহাস নির্ভর চিত্রনাট্যে লিপিবদ্ধ হয়েছে ধ্বংসের কুৎসিত অভিজ্ঞতা।

বলে নেওয়া ভালো তৎকালীন বিএনপি সরকার পরবর্তী ২০০৭ সালে ১৮৯ টি প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রী ফ্রান্সে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকার কর্তৃক চুক্তি করেছিলো।কিন্তু জনরোষে সেই চুক্তির বাস্তবায়ন হয়নি।এভাবেই একেএকে ধ্বংসের পায়তারা চলে।অথচ স্বাধীনতার এতোকাল পরে এসেও স্বাধীনতার পূর্বোত্তর ইতিহাস,ছাত্র আন্দোলন,ছয়দফা,নির্বাচন নিয়ে গণমানুষের অবদান প্রদর্শনীর জন্য কোন যাদুঘর নেই।মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান,ভারতে ২ কোটি শরনার্থীদের মানবেতর জীবন নিয়েও চিত্রনাট্য,সিনেমা,গল্পও গণমানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে স্বাধীনতার চেতনায় স্বকীয়তা অর্জন করতেও ব্যর্থ হয়েছে।এতো কিছু ব্যর্থতার পরেও,ব্যর্থতাকে আরো দীর্ঘায়িত করার জন্য যে অস্ত্র বিক্রির পায়তারা চলছে তা রোধ করতে হবে।রোধ করতে শিল্প সাংস্কৃতিক বোদ্ধাদের এগিয়ে আসতে হবে।গড়ে তুলতে হবে সাংস্কৃতিক আন্দোলন।

শিল্প সাংস্কৃতিক বোদ্ধাদের পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।অস্ত্র সংরক্ষণের ব্যাপারে তুলে ধরতে হবে মানবিক যুক্তি।গড়ে তুলতে হবে অস্ত্র স্মৃতি জাদুঘর।যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের উত্তরসুরীর ত্যাগ,বিদ্রোহ অনুভব করতে পাবে।যে অনুভবে তাদের চিন্তাচেতনার শিরা-উপশিরায়,রন্ধ্রে রন্ধ্রে মুক্তির চেতনা উৎসারিত হবে।

রাষ্ট্র যদি ইতিহাস ঐতিহ্যকে লালন না করে বরং বিমুখ করে তোলে তাহলে প্রজন্ম স্বকীয়তা হারিয়ে মেরুদন্ডহীন একটা প্রজন্মে পরিনত হবে।তাই একটা প্রজন্মকে গতিশীল করার জন্য তার ইতিহাস,ঐতিহ্যকে লালন করে চিন্তার স্বকীয়তা অর্জন করাতে হবে।অন্যথায় রাষ্ট্র ইতিহাস নির্মুল করে পুরো প্রজন্মকে 'অস্বীকারের সংস্কৃতি'(the politics of denial) এর দিকে ধাবিত করবে।ফলশ্রুতিতে জাতির জন্য 'স্বাধীনতা' শব্দটা বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।কেননা ইতিহাস থেকে মানুষ যে শিক্ষা নেয় তা মস্তিষ্কবৃত্তিক শিক্ষার পাশাপাশি হৃদয়বৃত্তিক শিক্ষাকেও জাগ্রত করে।আর হৃদয়বৃত্তিক শিক্ষা জাগ্রত না হলে সে জাতির সার্বিক উন্নয়ন বাধাপ্রাপ্ত হয়, সাথে অর্থনৈতিক উন্নয়নও।

তাই রাষ্ট্র আমলাতান্ত্রিক এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে উন্নয়নের বিজ্ঞাপন না দেখিয়ে রাষ্ট্রের ইতিহাস ঐতিহ্য লালন করে চেতনাগত অবস্থানের ভিত্তিতে স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ না করুক।যেনো অগ্রজদের পথই হয়,অনুজদের প্রেরণা।ইতিহাস লালনের মধ্য দিয়ে প্রাপ্ত শিক্ষাই হোক স্বাধীনতার শিক্ষা,আর সেই স্বাধীনতার শিক্ষাই ছড়িয়ে পরুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।


লেখকঃ

সফিউল আজম জিন্দা

শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান বিভাগ

ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়

No comments

Powered by Blogger.