উদ্বাস্তু রোহিঙ্গারা যেন দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে


উদ্বাস্তু রোহিঙ্গারা যেন দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে

রোহিঙ্গা নামটার সাথে মিশে আছে শত বছরের অযত্ন ও অবহেলার। একসময় স্বাধীন-স্বার্বভৌমত্তের অধিকারী রোহিঙ্গারাই আজ পৃথিবীর বৃহত্তম উদ্বাস্তু  জাতি। নিজ দেশ থেকে নির্যাতিত ও বিতারিত হয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে গেছে তারা। তবে হাজার সীমাবদ্ধতা সত্বেও যে দেশটি আপন ভিটেয় তাদের ঠাঁই দিয়েছে, লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে সে দেশেটি হল আমাদের বাংলাদেশ। তবে এদেশের  প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতা বোধ নেই বললেই চলে! কৃতজ্ঞতা স্বীকার দূরের কথা তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও রেহায় পায়নি তাদের হামলা থেকে।  আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কথা বাদ দিলাম বরং যারা তাদের আপন ঘর ছেড়ে দিয়েছে তাদের জন্য  সেই স্থানীয় জন প্রতিনিধিদের উপরও হাত তুলতেও অতটুকু দ্বিধাবোধ করেনি তারা।

তবে বেশ কিছু ঘটনায় বেশ ভাবিয়ে তুলেছে আমাদের। গত কয়েকদিন আগের ঘটনা, কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ৬ ও ৩ নাম্বর ক্যাম্পে পুলিশের উপর জঘন্য  হামলার ঘটনা ঘটে। আসামি ধরতে অভিযান  চালালে রাতের অন্ধকারে শত শত সন্ত্রাসী রোহিঙ্গা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় ৪ কনস্টেবল গুরুতর  আহত হন।

এ সমস্ত কার্যকালাপ গুলোই রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির কথা মনে করিয়ে দেয়,তারাই  গত বছর অক্টোবরে রাখাইনে পুলিশ ফাঁড়ির ওপর হামলা করে।  মিয়ানমার এক বিবৃতিতে বলে এই গ্রুপটির নেতৃত্বে রয়েছে রোহিঙ্গা জিহাদীরা, যারা বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তবে সংগঠনটি কত বড়, এদের নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত, তার কোন পরিস্কার ধারণা তাদের কাছে আজও নেই।

আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা 'ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ' তাদের এক রিপোর্টে বলছে, সংগঠনটি মূলত গড়ে উঠেছে সৌদি আরবে চলে যাওয়া রোহিঙ্গাদের দ্বারা। আরাকানে যারা এই সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত, তাদের আধুনিক গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ আছে বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের এই সংগঠনটির প্রতি সমর্থন এবং সহানুভূতি আছে। আর এই এটাই মূল চিন্তার কারন। আরসার প্রধান দাবি মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকত্ব নিয়ে হলেও বর্তমানে অধিকাংশ রোহিঙ্গা যেহেতু বাংলাদেশে আছে তাদের সুবিধা দেয়ার জন্য এদেশেও তাদের কার্যপরিধি বিস্তার করাটা অমূলক নয়।

গত ২৪ অক্টোবর কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে মুন্সীগঞ্জে ইয়াবা বিক্রি করতে এসে পুলিশের হাতে ছয় নারীসহ সাতজন রোহিঙ্গা আটক হয়েছে। এখন শোনা যাচ্ছে কক্সবাজারের টেকনাফ এবং উখিয়ার আশ্রয় শিবিরগুলোতে আধিপত্য বজায় রাখতে ইয়াবার বিনিময়ে অস্ত্র সংগ্রহ শুরু করেছে রোহিঙ্গারা। ২০ থেকে ৩০ হাজার ইয়াবা ঢাকায় পৌঁছে দেয়ার বিনিময়ে মিলছে বিদেশি পিস্তল। এগুলো কি স্রেফ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিবাদমান গ্রুপগুলোতে আধিপত্য বজায় রাখতে নাকি অন্য কোন উদ্দেশ্য আছে তা পরিস্কার হওয়া জরুরি। 
 রোহিঙ্গাদের ব্যবহৃত অস্ত্রের উৎসের সন্ধানে নেমে গত ৪ নভেম্বর নগরীর বাকলিয়া এলাকায় মার্কিন পিস্তল এবং ২টি ম্যাগজিনসহ আটক করে রাজ্জাক ও কামাল নামের দুই রোহিঙ্গাকে। তাদের ভাষ্য মতে ৩০ হাজার পিস ইয়াবা ঢাকায় পৌঁছে দেয়ার বিনিময়ে ক্যাম্পের জন্য মিলছে বিদেশি পিস্তল। এমনকি পুলিশের অনুসন্ধানে বের হয়ে আসছে, ইয়াবার বিনিময়ে অস্ত্র কেনার সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে প্রায় একশোর বেশি কথিত রোহিঙ্গা মাষ্টার। যারা মূলত গত মাসে সংঘটিত ৬ জন মার্ডারের মূল হোতা।

গত কয়েকদিন পূর্বে আমার টেকনাফ যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল নিজ কানে শুনে এসেছি স্থানীয়দের নিরব আর্তনাদ।  স্থনীয়রা রোহিঙ্গাদের নিকট এক প্রকার জিম্মি হয়ে আছে।  উখিয়া, টেকনাফে এখন রোহিঙ্গারাই সংখ্যালুঘু, তাদের মাঝে নাকি শৃঙ্খলার লেশ মাত্র নাই, যখন-তখন ছড়িয়ে পড়ছে দেশের নানাপ্রান্তে এমনকি ফাঁক-ফোঁকরে পাসপোর্ট নিয়ে চলে যাচ্ছে বিদেশেও।  গত কয়েকমাস আগে সৌদিতে যাওয়া বাংলাদেশ পাসপোর্টধারী রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে আনতে চাপ দেয়া হয়েছিল। 

তারা যদি এমন করেই বেশামাল হয়ে উঠে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা দিন দিন আরো কঠিন হয়ে যাবে, কবে আবার শুনতে হয় রোহিঙ্গারা সশস্ত্র বিদ্রোহের ডাক দিয়েছে এর আগেই যা যা করার সব করতে হবে। ৮৫ কিলো মেরিন ড্রাইভে দশটার উপর চেকপোস্ট না দিয়ে যেই টেকনাফের রাস্তা দিয়ে তারা ইয়াবা-অস্র চালান দেয় সেখানে চেকপোস্ট বসাতে হবে নয়ত আরো ভয়াবহ সংবাদের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের কিছু করার থাকবে না।

ট্রাম্প আমলে রোহিঙ্গা ইস্যু গুরুত্ব না পেলেও বাইডেনের নতুন পররাষ্ট্র নীতিতে রোহিঙ্গা ইস্যুটি স্থান করে নিতে পারে বলে মনে করেন অনেক কূটনীতিকরা। কেননা বাইডেনের উপদেষ্টাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আছেন যারা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে কাজ করেছেন এবং তারা সবাই রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। তাই বাইডেন তার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কী হবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই বাংলাদেশের উচিত হবে তার সঙ্গে এ বিষয়ে পূর্ণ যোগাযোগ করা। 

লেখক:
আবু জাফর 
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
abujafor295610@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.