পথশিশু মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি!



বাংলাদেশ!
স্বাধীন দেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও বিশ্ববন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন দেখানো সেই সোনার বাংলাদেশ গড়ার দ্বারপ্রান্তে আজ আমরা। আজ আমরা সভ্যতার উচ্চ শিখরে অবস্থান করছি। মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলছি। শান্তির মিছিলে অংশগ্রহণ করছি।ক্ষুধা-যন্ত্রণা-দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব গড়ার প্রত্যয়ে সংকল্পবদ্ধ হচ্ছি। পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে চলেছি সফলতার দ্বারপ্রান্তে।

কিন্তু কেন জানি কোথায় একটু কমতি থেকে গেলো। কেনো জানি বারবার মনে হচ্ছে আমরা পথশিশুদের জন্য কিছু করতে পারিনি। রাজধানী, মহানগর, শহরাঞ্চলে বর্তমানে সারা দেশেই লাখ লাখ শিশু জন্ম নিচ্ছে ও রয়েছে পথেই যাদের জন্ম ও বসবাস। পথে পথে বেড়ে ওঠা এমন শিশুদেরকে শুধু পথশিশু বলেই আখ্যায়িত করা হয় না। টোকাই পথকলি,ছিন্নমূল,বি-জন্মা বা আরো অনেক খারাপ খারাপ অহেতুক নামে ডাকা হয়ে থাকে।

পথশিশুদের জীবনযাপন অত্যন্ত দুর্বিষহ। তারা জানে না আলো-অন্ধকার, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য। এই আধুনিক যুগে জন্মগ্রহণ করলেও গুহায় বসবাস করা আদিম মানুষের জীবনমান থেকে তাদের জীবনমান উন্নত নয়। অধিকাংশ সময়ই রাস্তা, পার্ক, ট্রেন ও বাস স্টেশনে, লঞ্চঘাটে, সরকারি ভবনের নিচে ঘুমায়। বিভিন্ন হোটেলের পচা-বাসি খাবার, এমনকি ডাস্টবিনে ফেলা দুর্গন্ধযুক্ত খাবারও খেয়ে থাকে। ডাস্টবিনের পরিত্যক্ত খাবার তাদের ভাগ করে খেতে হয় কুকুরের সঙ্গে। তারা শিক্ষাবঞ্চিত। তারা ক্ষুধার্ত, অসহায়, রুগ্ন, নির্যাতিত, অধিকারবঞ্চিত মানবসন্তান।

এতোটা অবহেলিত হবার পরে দেখা যাচ্ছে- একটা শিশু তার কর্মস্থল না পেয়ে, কোনো কাজ কোনো খাবার না পেয়ে মাদকে আসক্ত হয়ে পরে। সর্বনাশা মাদকের ভয়াল বিষে আসক্ত হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের লাখো পথশিশু। এছাড়াও সমাজের কিছু নিকৃষ্ট নেতারা হাতের অস্ত্র হিসেবে পথশিশুদের ব্যাবহার করে যাচ্ছে। পেটার ক্ষুধা নিবারনের জন্য সকল অপকর্মে যুক্ত হচ্ছে এই পথশিশুরা।

একটা পথশিশু সঠিকভাবে তার বাবা-মায়ের নাম ও বলতে পারে না। আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি- আমি কিছুদিন আগে বরিশালের বিবির পুকুর পাড়ে বসা। এসময় একটা ছেলে আধ-ময়লা পড়া জামা কাপড়। 
এসে বলে ভাইয়া...ও... ভাইয়া ..
কিছু খেতে দাও না। আমি তখন জিঙ্গেস করি "তোমার নাম কি?
'নাম বললো।
'বললাম বাবার নাম কি?
'উত্তর দিল আকাশ!
'মানে? বললো ঐ আকাশ।
আমি অবাক হলাম।
'আর মায়ের নাম?
'উত্তর দিলো এই মাঠি!

খুব আফসোস হলো ছেলেটার জন্য ওর ও তো বাবা-মা আছে।
তাহলে কারা?
ও কি জানতে পারবে কোনোদিন?
ওর সাথে আমাকে কথা বলতে দেখে আমার বন্ধুরা আমাকে বকাবকি করলো। কারন ছেলেটা একটা টোকাই।
আমার পাশে বসালে নাকি আমার অপমান হবে।

তখন খুব কষ্ট পাই যখন রাস্তায় কাউকে বলতে শুনি- ‘কী দরকার এসব নোংরা অবৈধ বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করার?’
ওদের তো জন্মেরই ঠিক নেই। আরে ভাই, ও কি পিতা-মাতা ছাড়া পৃথিবীতে এসেছে?

বিবেকের দংশনে সেসব সমালোচকের উদ্দেশে বলতে চাই- সৃষ্টিকর্তার কোনো সৃষ্টিই নোংরা বা অবৈধ হতে পারে না। এরা প্রত্যেকেই সৃষ্টির সেরা জীব মানবসন্তান।

আসলে মানুষ এরকমই হয়।
একটু চিন্তা করুন, এই যে পথশিশুরা ওরাও তো কারও না কারও সন্তান, আত্মীয়-স্বজন। আল্লাহর সৃষ্টি সেরা জীব মানুষ হওয়ার কারণে পথশিশুদেরও রয়েছে ন্যায্য অধিকার। স্বাধীন দেশে এ পথশিশুদেরও সমান সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বড় হওয়ার অধিকার আছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এ মৌলিক চাহিদাগুলো যথোপযুক্তভাবে পাওয়ার অধিকার তাদেরও আছে।

একটুখানি চিন্তা করুন ভাই।
ফুল যেখানেই ফুটুক না কেন সেখান থেকেই সুগন্ধ ছড়াবে।
নর্দমায় জন্মানো বৃক্ষের ফুল যেমন সুগন্ধ ছড়ায়, বাগানের ফুলও তেমনটা ছড়ায়। তেমনি পথে বাস করা আমাদের এসব শিশুও সুন্দর, নিষ্পাপ ও পবিত্র। তাদেরও সুন্দর হৃদয় ও মন আছে। এগিয়ে আসুন, অবশ্যই সুগন্ধ পাবেন। পথের অলিগলিতে খোলা আকাশের নিচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বঞ্চিত, উপেক্ষিত শিশুদেরও আছে তীক্ষ্ণ মেধা। তাদের চাহনিতে দেখতে পাই নতুনকে আবিষ্কার করার আগ্রহ। হয়তো তাদের মধ্যেও লুকিয়ে আছে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।

পথশিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা বাস্তবায়নের অঙ্গীকারে পালিত হোক জাতীয় পথশিশু দিবস।

শিশুদের অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে। পথশিশুদের অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ হয়ে সর্বক্ষেত্রে পথশিশুদের পাশে দাড়ানোর দৃঢ় প্রত্যয় নিতে হবে আমাদেরকে, তাহলেই পথশিশু নামে দেশে কিছু থাকবে না৷ গড়ে উঠবে সুন্দর একটি বাংলাদেশ৷

সম্ভাবনার এমন সন্ধিক্ষণে আমরা কি পথশিশুমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতে পারি না? আসুন আমরা সবাই পথশিশুদের পাশে দাঁড়াই এবং পিতৃত্ব, মাতৃত্ব অথবা ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে তাদেরকে গ্রহণ করি।

লেখকঃ
তাসফীর ইসলাম (ইমরান)
শিক্ষার্থী,সার্ভে ইঞ্জিনিয়ারিং
বাসাই 
imran187619@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.